Thursday, 29 December 2016

Syria conflict: Ceasefire agreed for midnight, backed by Russia and Turkey

The Syrian government and rebel groups have agreed to a ceasefire from midnight (22:00 GMT) across the country, followed by peace talks.
The deal was announced by Russian President Vladimir Putin and confirmed by the Turkish foreign ministry.
Russia and Turkey, which back opposing sides in the bitter conflict, will act as guarantors.
Turkey said all fighting including air strikes would be halted. However, some jihadist groups are excluded.
The Syrian army said in a statement that so-called Islamic State (IS) and Jabhat Fateh al-Sham (formerly the Nusra Front) "and the groups affiliated to them" were excluded.
An opposition spokesman confirmed the agreement but a rebel source quoted by Reuters news agency said only IS areas were not covered by the truce.
The ceasefire reportedly does cover the rebel-held Eastern Ghouta area near Damascus, which had been a sticking-point in negotiations.
Earlier this month, Moscow and Ankara negotiated a ceasefire in Syria's second city, Aleppo, that led to tens of thousands of rebel fighters and civilians being evacuated from an enclave besieged by government forces.
Previous ceasefire initiatives this year brokered by the UN, or the US acting with Russia, quickly collapsed.
The Turkish foreign ministry said it was crucial for all states with influence over the groups in Syria to comply with and to support the ceasefire.
That could be seen as an obvious plea to Washington, among others, the BBC's Selin Girit reports.

'Fragile' deal

Mr Putin announced in Moscow that three documents had been signed:
  • An agreement between the Syrian government and the armed opposition on a ceasefire
  • Measures for overseeing the ceasefire
  • An agreement to start peace talks
He described the deal as "fragile" but he praised the agreements as the result of the work of Russia's defence and foreign ministries with Moscow's partners in the region.

He added that he agreed with a proposal by the defence ministry to reduce Russia's military presence in Syria but made it clear Moscow would "continue fighting international terrorism and supporting the Syrian government".
A spokesman for the Syria's leading opposition body, the National Coalition, told news agencies it backed the ceasefire.
"The National Coalition expresses support for the agreement and urges all parties to abide by it," Ahmed Ramadan told AFP.
He said that key rebel groups including the powerful Ahrar al-Sham and Army of Islam factions had signed the ceasefire deal, though there was no immediate confirmation from rebel officials, AFP notes.
Speaking to AP, he added that members of the Free Syrian Army, a loose alliance of several moderate rebel factions, would abide by the truce but retaliate to violations by government and forces and their allies.

'They got what they wanted'

Speaking before the agreement was reached, Diana Darke, a Middle East expert, said she was optimistic as Russia and Iran had achieved their war goals.
"Potentially everybody has finally reached the stage where they are ready," she told the BBC World Service's Newsday programme.
"They can see that there is nothing further to be gained. I mean Russia does not want to be sucked more and more in to the Syrian quicksand. They've got what they wanted. The same for Iran. The Syrian government itself is incredibly weak."
At least 300,000 people are believed to have been killed in the fighting which followed the uprising against President Bashar al-Assad in March 2011.
Fifteen civilians, including six children, were reportedly killed by air and artillery strikes on Eastern Ghouta on Thursday.
A further four million have fled the country to seek refuge in neighbouring states or Europe.

Monday, 26 December 2016

যে কারণে বাংলাদেশকে জরিমানা করেছে আইসিসি

আড়াই বছরেরও বেশি সময় পর দেশের বাইরে নিউজিল্যান্ড সফর নিয়ে বেশ আগ্রহী ছিল টাইগাররা।
কিন্তু, তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে ৭৭ রানে হেরেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।দলের হারের তিক্ত স্বাদের সঙ্গে মাশরাফিদের ঘাড়ে যোগ হয়েছে জরিমানার বোঝাও।
স্লো ওভার রেটের কারণে বাংলাদেশকে জরিমানা করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ক্রাইস্টচার্চে ২৬ ডিসেম্বর সোমবার ম্যাচের জন্য বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে ম্যাচ ফির ২০ শতাংশ এবং বাকি খেলোয়াড়দের ১০ শতাংশ জরিমানা করেন ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড। ৫০ ওভারের জন্য নির্ধারিত সময়ের পর এক ওভার বাকি থাকায় এ শাস্তি পেতে হয় টাইগারদের।
বেশি সময় খরচ করায় বাংলাদেশ দলের উপর অভিযোগ আনেন মাঠের দুই আম্পায়ার ওয়াইন নাইটস ও চেত্তিহদি সামসুদ্দিন, তৃতীয় আম্পায়ার পল রাইফেল এবং চতুর্থ আম্পায়ার ক্রিস ব্রাউন আইসিসি কোড অব কন্ডাক্টের ২.৫.১ ধারা অনুযায়ী এ ধরণের অপরাধের জন্য সকল খেলোয়াড়কে ওভারপ্রতি ১০ শতাংশ এবং অধিনায়ককে তার দ্বিগুণ জরিমানা করা হয়। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তিই পেতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
ম্যাচ শেষে শুনানির জন্য মাশরাফিকে ডেকে নেওয়া হয় রেফারি ব্রডের কাছে। তবে বাংলাদেশ অধিনায়ক নিজের দোষ শিকার করে নেওয়ায় কোন শুনানির প্রয়োজন হয়নি।

Saturday, 10 December 2016

ভারতের জন্যই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে পাকিস্তান!

সৌদি আরবকে পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র দিয়েছে কিনা, এ প্রশ্ন দীর্ঘ দিনের। পাকিস্তানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাসনিম আসলামের কাছে সম্প্রতি আবারো এই প্রশ্নটিই করেছিল রাশিয়ার সংবাদ মাধ্যম ‘স্পুতনিক’। এই প্রশ্নের জবাবে তাসনিম আসলাম বলেছেন, ভারতের পক্ষ থেকে এ ধরনের খবর ছড়ানো হয়েছে। এর কোনো ভিত্তি নেই।
তিনি আরো বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে এই ধরনের কোনো সমঝোতা হয়নি এবং সৌদি আরবকে পরমাণু অস্ত্র সরবরাহের খবরের কোনো ভিত্তি নেই। পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র বিস্তারের বিরোধী। তাসনিম আসলাম বলেন, ১৯৭৪ সালে ভারত পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালানোর আগে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারত পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এরপর ইসলামাবাদ বাধ্য হয়ে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে। সৌদি আরব পরমাণু অস্ত্র কিনতে চায় বলে ২০১৫ সালের মে মাসে খবর বেরিয়েছিল। 
মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে সানডে টাইমস লিখেছিল, সৌদি আরব পাকিস্তান থেকে পরমাণু অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা করেছে। পত্রিকাটি আরো লিখেছিল, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের একটা বড় অংশই সৌদি আরব দিয়ে থাকে। পাকিস্তান থেকে মিসর ও তুরস্কও পরমাণু অস্ত্র পেতে পারে বলে পত্রিকাটির খবরে দাবি করা হয়েছিল।

বিদেশি কর্মী নিয়োগ বরদাস্ত করা হবে না : ট্রাম্প

আভাস দিয়েছিলেন আগেই। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মাস খানেক পরই ফের কাজ চুরি নিয়ে সরব হলেন সদ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন নাগরিকদের পরিবর্তে এইচ- ওয়ান বি ভিসার অধিকারী ভারতীয়সহ বিদেশি কর্মীদের চাকরি দেওয়া একেবারেই বরদাস্ত করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন। আইওয়াতে সমর্থকদের মাঝে ভাষণ দিচ্ছইলেন। 
ডিজনি ওয়ার্ল্ড এবং অন্যা মার্কিন সংস্থাগুলিকে নিশানা করে বলেন, ‘‌প্রত্যেকমার্কিনাগরিকেরনিরাপত্তার জন্য সংগ্রাম চলবে। নির্বাচনী প্রচারের সময় চাকরি থেকে ছাঁটাই হওয়া অনেক মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। কথা বলে জানতে পেরেছি, বিভিন্ন সংস্থা তাদের জায়গায় বিদেশি কর্মী আনা হয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। রাজি না হলে নাকি প্রাপ্য টাকা না দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। এর চেয়ে বেশি অবমাননাকর কিছু হতে পারে নাকি?‌’‌ সম্প্রতি অরল্যান্ডোর ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন লিও পেরেরো এবং ডেনা মুর নামের দুই তথ্য প্রযুক্তি কর্মী। 
তাদের অভিযোগ, ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে রীতিমতো ষড়যন্ত্র করে তাঁদের হঠিয়ে, অপেক্ষাকৃত কম পারিশ্রমিকে এইচ- ওয়ান বি ভিসা পাইয়ে দিয়ে ভারতীয় এবং অন্য বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে সংস্থাগুলি। মামলায় এইচ সি এল এবং কগনিজ্যান্টের মতো সংস্থআকেও টেনে এনেছেন তাঁরা। সেই প্রসঙ্গেই এমন মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। বলেছেন, ‘খুব ভাল করে জানি কোন সংস্থাগুলি এমন করেছে। এসব বেয়াদপি আর বরদাস্ত করা হবে না।’‌ 
‌নির্বাচনী প্রচারের সময়ই ভারত সহ অন্য বিদেশি কর্মীদের বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের কাজ চুরির অভিযোগ তুলেছিলেন ট্রাম্প। ক্ষমতায় এলে কড়া ব্যবস্থা নেবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন বিভিন্ন সংস্থাকে। বৃহস্পতিবার আইওয়াতে সেই প্রতিশ্রুতির কথাই মনে করিয়ে দিলেন তিনি। বেআইনি অভিবাসন নিয়েও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। মাদকের আমদানি রুখতে মেক্সিকো সীমান্ত বরাবর দেয়াল নির্মাণে প্রতিশ্রুতি পালন করবেন বলে জানিয়েছেন।

Friday, 9 December 2016

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন ও অনুমতি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম,
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আ’লা রাসূলিহিল কারীম,
আম্মা বা’দ।
শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী সাহেব বর্তমান ইসলামী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও গণ্যমান্য আলেম-এ-দ্বীন। তাঁর সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার সুযোগ আমার নেই। তিনি অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা, যার মধ্যে ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:)-বিষয়ক এই বইখানি অন্যতম। সর্ব-জনাব মুহাম্মদ ইমরান সুলাইমান ও ওয়াক্কাস আহমদ আমীন কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত এবং মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশানাল কর্তৃক প্রকাশিত প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার এ বইটির বাংলা অনুবাদকর্মে আমি হাত দিতে যাচ্ছি। আল্লাহ পাক তাঁর হাবীব (দ:)-এর অসীলায় এবং আমার পীর ও মোর্শেদ (রহ:)-এর নেক-নজরে আমাকে কামিয়াব করুন, আমীন।
-কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
মওলিদুন্নবী (দ:)
আল্লাহর নামে আরম্ভ, যিনি পরম দয়ালু, করুণাময়
(হে রাসূল) বলুন: আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া (মহানবীকে তাদের মাঝে প্রেরণের মাধ্যমে); সেটারই ওপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত হতে শ্রেয়। [আল-কুরআন, ১০:৫৮; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেব কৃত তাফসীরে নূরুল এরফান বাংলা সংস্করণ]
মহানবী (দ:)-এর হাদীস শরীফ –
আমি হলাম আমার পূর্বপুরুষ (পয়গম্বর) ইবরাহীম (আ:)-এর দোয়া এবং পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত শুভসংবাদ। (আমার ধরাধামে শুভাগমনের সময়) আমার মা তাঁর (পবিত্র দেহ মোবারক) হতে নূর (তথা আলো/জ্যোতি) প্রত্যক্ষ করেন যা শাম-দেশের অর্থাৎ সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত করে। [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল]
শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী
শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী সাহেব ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের ঝং শহরের আউলিয়া-দরবেশ, আলেম-পণ্ডিত ও শিক্ষকদের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার হাতে খড়ি হয় ১২ বছর বয়সে, মাদ্রাসা আল-উলূম আল-শরীয়্যা নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি মদীনাতুল মুনাওয়ারায় মহানবী (দ:)-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ আইয়ুব আনসারী (রা:)-এর আশীর্বাদধন্য বসতঘরেই অবস্থিত। ড: কাদেরী তাঁর পিতা ও সে সময়কার প্রসিদ্ধ উলামাদের কাছে ইসলামবিষয়ক বিভিন্ন শাস্ত্র ও আরবী বিদ্যা শিক্ষা করেন। ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি সারা ইসলামী বিশ্ব ঘুরে বেড়ান; মক্কা মুয়াযযমা, মদীনা মুনাওয়ারা, সিরিয়া, বাগদাদ, লেবানন, মাগরেব তথা পশ্চিমাঞ্চল, ভারত ও পাকিস্তানে অনেক প্রখ্যাত আলেমের অধীনে তিনি ধর্মবিদ্যা শিক্ষা করেন; আর তাঁদের কাছ থেকে হাদীসশাস্ত্র ও অন্যান্য ইসলামী আধ্যাত্মিক জ্ঞানের শাস্ত্রে প্রায় ৫০০ এজাযত ও সনদ লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে এজাযতের একটি নজিরবিহীন, অনন্য ও মহাসম্মানিত সনদ যা তাঁকে চারজন শিক্ষকের মাধ্যমে সংযুক্ত করেছে সাইয়্যেদুনা শায়খ আবদুল কাদের জিলানী আল-হাসানী ওয়াল হুসাইনী আল-বাগদাদী (রহ:)-এর পুত্র শায়খ আবদুর রাযযাক (রহ:)-এর সাথে, ‘ফুতুহাতে মক্কীয়্যা’ গ্রন্থপ্রণেতা শায়খুল আকবর মুহিউদ্দীন ইবনে আরবী আল-দামেশকী (রহ:)-এর সাথে এবং মিসরীয় মহান হাদীসশাস্ত্র বিশারদ ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:)-এর সাথেও। অপর একটি সনদ দ্বারা তিনি কেবল একজন শিক্ষকের মাধ্যমে ইমাম ইউসূফ বিন ইসমাঈল নাবহানী (রহ:)-এর সাথে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর সনদগুলো তাঁরই দুইটি ‘সাবত’ তথা বিস্তারিত তালিকায় প্রকাশিত হয়েছে: ‘আল-জওয়াহির আল-বাহিরা ফীল্ আসানিদ আত্ তাহিরা’ এবং ‘আল-সুবূল আল-ওয়াহাবিয়্যা ফীল্ আসানিদ আল-যাহাবিয়্যা’।
শিক্ষা ক্ষেত্রে ড: কাদেরী সাহেব ১৯৭০ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক প্রথম শ্রেণি (সম্মান) সনদ লাভ করেন। ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে ১৯৭২ সালে ইউনিভার্সিটি গোল্ড মেডাল-সহ এম,এ, এবং ১৯৭৪ সালে এল,এল,বি, পাশ করার পর তিনি ঝং জেলা কোর্টে আইন পেশার সাথে যুক্ত হন। তিনি ১৯৭৮ সালে লাহোরে চলে আসেন এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে প্রভাষকের পদে যোগ দেন; আর ইসলামী আইনশাস্তে তাঁর ডক্টরেট-ও সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে তাঁকে ইসলামী আইন বিভাগে অধ্যাপক পদে নিয়োগ করা হয় এবং তিনি এল,এল,এম, পর্যায়ে ইসলামী আইন প্রণয়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ড: তাহিরুল কাদেরী সাহেব পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টের এপেলেট শরীয়াহ বেঞ্চের আইনি উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইসলামী পাঠ্যক্রম উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা পদেও দায়িত্ব পালন করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ইসলামী আইনজ্ঞ ও পণ্ডিতের সু্খ্যাতি অর্জন করেন এবং ইসলামী বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমে দ্বীন হিসেবে পরিচিতি পান। অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা, গবেষক ও সুবক্তা ড: কাদেরী সাহেব প্রায় এক সহস্র পুস্তক প্রণয়ন করেছেন, যার মধ্যে চার’শ পঞ্চাশটিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে; আর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আরবী, উর্দূ ও ইংরেজি ভাষায় ছয় সহস্রাধিক প্রভাষণও প্রদান করেছেন।
ইসলামের নামে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও সন্ত্রাসবাদের মতো জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শায়খুল ইসলাম ড: তাহিরুল কাদেরী সাহেব একটি ঐতিহাসিক ফতোওয়া জারি করেন। এটাকে একটা তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করা হয়, কেননা এ-ই প্রথমবার যখন সন্ত্রাসের হোতাদের বিরুদ্ধে এধরনের একটি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ইসলামী ডিক্রী তথা ফতোওয়া এতো ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়। ছয়’শ পৃষ্ঠাসম্বলিত মূল ফতোওয়াটি লেখা হয়েছিল উর্দূ ভাষায়, আর এতে বিধৃত হয়েছিল ব্যাপক গবেষণালব্ধ আল-কুরআনের বাণী, মহানবী (দ:)-এর হাদীস, আসহাব-এ-কেরাম (রা:)-এর মতামত ও বিশ্ববরেণ্য ইসলামী পণ্ডিতদের সর্বজনগৃহীত লেখনীসমূহ। এই ঐতিহাসিক গবেষণাকর্ম ইংরেজি ও ইন্দোনেশীয় ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে; অপরদিকে আরবী, নরওয়েজীয়, ড্যানিশ, হিন্দী ও অন্যান্য প্রধান প্রধান ভাষায় এর অনুবাদের কাজ চলছে। মিসরীয় জামেউল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী গবেষণা একাডেমী এই ফতোওয়ার ওপর একটি বিস্তারিত বিবরণ লিখেছে এবং এর প্রতিপাদন-ও করেছে।
ড: কাদেরী সাহেব মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশানাল (এম,কিউ,আই) সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পদে দায়িত্বরত। এই সংস্থার শাখা ও সেন্টারগুলো বিশ্বের নব্বইটিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে আছে। শায়খ তাহিরুল কাদেরী সাহেব পাকিস্তানের লাহোর শহরে অবস্থিত মিনহাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অফ গভর্নরস্-এর সভাপতি; বিশ্ববিদ্যালয়টি পাকিস্তানের সরকারি সনদপ্রাপ্ত। এছাড়াও তিনি মিনহাজ শিক্ষা সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা, যে সংস্থাটি পাকিস্তানে ছয় শতাধিক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। ড: কাদেরী মিনহাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশনেরও সভাপতি; যে সংস্থাটি সারা বিশ্বে মানবিক ও সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
সূচিপত্র
মুখবন্ধ
প্রথম অধ্যায়
মওলিদুন্নবী (দ:) ও ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শন: সঠিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের আলোকে
১.১ আল-কুরআনের প্রদর্শিত হেদায়াত হিসেবে ‘যিকরের’ তাৎপর্য
১.২ পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর দ্বীন (ধর্ম)
পরিচ্ছেদ – ১
আম্বিয়া (আ:)-এর স্মরণে (যিকরে): পাঁচ ওয়াক্ত নামায
১.৩ ফজরের নামায: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর স্মরণে
১.৪ যোহরের নামায: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মরণে
১.৫ আসরের নামায: পয়গম্বর উযায়র (আ:)-এর স্মরণে
১.৬ মাগরেবের নামায: পয়গম্বর দাউদ (আ:)-এর স্মরণে
১.৭ ’এশার নামায: মহানবী (দ:)-এর স্মরণে
পরিচ্ছেদ – ২
আম্বিয়া (আ:)-এর স্মরণে (যিকরে): হজ্জ্বের বিভিন্ন রীতি ও প্রথা
১.৮ এহরাম: হজ্জ্বে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের পরিধেয় বস্ত্রের স্মরণে
১.৯ তালবিয়া: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) কর্তৃক হজ্জ্বের প্রতি আহ্বান ও তার উত্তরের স্মরণে
১.১০ তওয়াফ: আম্বিয়া (আ:)-এর সুন্নাহ (রীতিনীতি)-এর স্মরণে
১.১১ রামল: মহানবী (দ:) ও সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর দ্বারা অনুশীলিত তওয়াফ-পদ্ধতির স্মরণে
১.১২ ইদতিবা: সর্বশেষ নবী (দ:)-এর সুন্নাহ
১.১৩ কালো পাথর চুম্বন: আল্লাহর প্রিয় বান্দার অনুশীলিত প্রথার স্মরণে
১: ১৪ মাক্বামে ইবরাহীম: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মরণে
১:১৫ সাফা ও মারওয়া’র সাঈ: হযরত মা হাজেরের সুন্নাহর স্মরণে
১:১৫.১ যমযম কূপ: নামের উৎপত্তির কারণ
১.১৬ আরাফাত, মুযদালিফা ও মিনা: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর স্মরণে
১.১৭ আরাফাত ও মুযদালিফায় আদায়কৃত নামাযের একত্রীভবন: মহানবী (দ:)-এর সুন্নাহ
১.১৮ পশু কুরবানি: পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর স্মরণে
১.১৮.১ কুরবানির পশু: আল্লাহর চিহ্নগুলোর একটি
১.১৯ কঙ্কর নিক্ষেপ প্রথা: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর সুন্নাহ
১.১৯.১ একটি আপত্তি
১.১৯.২ আপত্তির প্রতি আমাদের জবাব
দ্বিতীয় অধ্যায়
আনন্দ ও বিষাদময় ঘটনার স্মরণে
২.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর দিবসের স্মরণে
২.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)-এর দিবসের স্মরণে
২.৩ ইসলাম-ধর্মের পূর্ণতাপ্রাপ্তির দিবস: খুশি উদযাপনের দিন (ঈদ)
২.৪ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নির্দেশ
২.৪.১ আল-হিজরে অবস্থিত সামুদের কুয়ো হতে পানি পানে নিষেধাজ্ঞা
২.৪.২ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের সাথে সংশ্লিষ্ট কুয়ো হতে জলপানসম্পর্কিত আদেশ
২.৪.৩ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের স্মরণে
২.৪.৪ সামূদের প্রতি বিধানকৃত শাস্তি স্মরণকালে দুঃখ প্রকাশ
২.৪.৫ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নিজস্ব আমল
২.৪.৫.১ বিবেচনাযোগ্য বিষয়াবলী
২.৫ হস্তীবাহিনীর লোকদের প্রতি অবতীর্ণ শাস্তির স্মরণ এবং মুহাসসির উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম
২.৬ হযরত উমর ফারূক (রা:) কর্তৃক ব্যক্ত অনুতাপ
তৃতীয় অধ্যায়
আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের স্মরণ: একটি কুরআনী বিশ্লেষণ
৩.১ মওলূদের পটভূমি
৩.২ আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের স্মরণ: এক ঐশী-প্রথার চর্চা
৩.৩ আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের তাৎপর্য
৩.৩.১ পয়গম্বর আদম (আ:)-এর মওলিদ
৩.৩.২ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর মওলিদ
৩.৩.৩ মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদ
৩.৩.৪ পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ
৩.৩.৫ পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদ
৩.৩.৬ মনোনীত জন – মহানবী (দ:)-এর মওলিদ
৩.৪ আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদ হতে মহানবী (দ:)-এর মওলিদের ধারাবাহিকতা
চতুর্থ অধ্যায়
মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সমর্থনে আল-কুরআনের দলিল
৪.১ কুরআন নাযেলের উদযাপন হতে দলিল
৪.১.১ লাইলাতুল কদরের রাত ও বেলাদত শরীফের রাতের মধ্যকার তুলনা
৪.২ কোনো নেয়ামত লাভের উদযাপন হতে দলিল
৪.৩ মুক্তি লাভের উদযাপন হতে দলিল
৪.৩.১ সভ্যতা জারি থাকার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় বিষয়
৪.৪ কোনো খোদায়ী আশীর্বাদ লাভে খুশি প্রকাশ করা আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের সুন্নাত
৪.৪.১ বিবেচনাযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
৪.৫ মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের পক্ষে খোদায়ী আদেশ
৪.৫.১ ‘ক্বুল’ (বলুন) শব্দটির মধ্যে লুক্কায়িত কুরআনী দর্শন
৪.৫.১.১ আল্লাহতে বিশ্বাসের আগে রাসূল (দ:)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অপরিহার্যতা

৪.৫.১.২ ‘ক্বুল’ (বলুন) শব্দটির ব্যবহার দ্বারা খোদায়ী আজ্ঞার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বৃদ্ধি
৪.৫.২ মহানবী (দ:) হলেন আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা
৪.৫.২.১ একটি কৌতূহলোদ্দীপক বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়
৪.৫.২.২ কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর/ব্যাখ্যা
৪.৫.২.২.১ “এবং আল্লাহ-ই সবচেয়ে বেশি ফযল তথা অনুগ্রহশীল” মর্মে আয়াতটির অর্থ
৪.৫.২.২.২ বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থগুলোতে ‘ফযল’ শব্দটির অর্থ
৪.৫.২.২.৩ বিখ্যাত তাফসীরগুলোতে ‘ফযল’ ও ‘রহমত’ (করুণা) শব্দগুলোর অর্থ
৪.৫.২.২.৪ মৌ: আশরাফ আলী থানবীর দৃষ্টিভঙ্গি
৪.৫.৩ আমরা কেন ‘ফযল’ ও ‘রহমত’-প্রাপ্তি উদযাপন করবো তার বর্ণনা
৪.৫.৪ আয়াতটিতে (ঐশী আজ্ঞা) সীমিতকরণসূচক শব্দার্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য
৪.৫.৫ আয়াতোল্লিখিত ‘ফাবিযালিকা’ (সেটারই মধ্যে) কথাটি ব্যবহারের গূঢ়রহস্য
৪.৫.৬ ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে (ঐশীদানের প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
৪.৫.৭ এই আয়াতে পাকে অনেক তাকিদমূলক শব্দের প্রয়োগ
৪.৫.৮ “তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়” মর্মে আয়াতটির তাফসীর (ব্যাখ্যা)
৪.৬ খোদায়ী মহা অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের নিদর্শন-ই মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন
৪.৭ ঐশী করুণা ও আশীর্বাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কেন জরুরি?
৪.৮ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন প্রচলিত পদ্ধতি
৪.৮.১ খোদায়ী নেয়ামতের স্মরণ ও উল্লেখ (যিকর-তাযকেরা)
৪.৮.২ এবাদত ও বন্দেগী
৪.৮.৩ প্রাপ্ত আশীর্বাদের ঘোষণা প্রদান
৪.৮৩.১ এই আশীর্বাদের ঘোষণা আমরা কীভাবে দেবো?
৪.৮.৪ ঈদ-উৎসব হিসেবে পালন
পঞ্চম অধ্যয়
মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সমর্থনে হাদীসের দলিল
৫.১ ‘এয়াওমে আশুরা’ (মহররমের ১০ তারিখ) পালনের দলিল
৫.১.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর দিবসটি উদযাপন
৫.১.২ মহানবী (দ:) কর্তৃক ওই দিবসটি পালন মূসা (আ:)-এর সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কারণেই
৫.১.৩ ইহুদীদের ‘এয়াওমে আশুরা’কে উৎসব হিসেবে পালন
৫.১.৪ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর পক্ষে ইমাম আসকালানী (রহ:)-এর প্রামাণিক দলিল
৫.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)-এর দিবস উদযাপনের পক্ষে দালিলিক প্রমাণ
৫.৩ কা’বা শরীফের আচ্ছাদন পরিবর্তন দিবস পালনের প্রামাণ্য দলিল
৫.৪ দ্বীন-ইসলামের পূর্ণতাপ্রাপ্তি দিবসকে ঈদ হিসেবে উদযাপনের দলিল
৫.৫ জুমুআ’ দিবসের মাহাত্ম্য: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টি হয় এদিনে
৫.৫.১ জুমুআ’ দিবস: (রাসূল-দ:-এর প্রতি) সালাওয়াত ও সালাম প্রেরণের দিন
৫.৬ পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর জন্মস্থানের গুরুত্ব ও এর যেয়ারত
৫.৭ মহানবী (দ:) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন রোযা পালনের মাধ্যমে
৫.৮ মহানবী (দ:) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন পশু কুরবানীর মাধ্যমে
৫.৯ মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনে খুশি প্রকাশ করায় এক কাফেরের শাস্তি লাঘব
৫.৯.১ কেন এক কাফেরের শাস্তি লাঘব করা হয়েছে?
৫.৯.২ একটি আপত্তি ও তার জবাব
৫.৯.৩ একটি উপদেশ
ষষ্ঠ অধ্যায়
মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন-এ-কেরাম ও ইমামবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি
৬.১ হুজ্জা আল-দীন ইমাম মুহাম্মদ বিন যুফার (৪৯৭-৫৬৫ হিজরী)
৬.২ শায়খ মুঈন আল-দীন উমর বিন মুহাম্মদ আল-মাল্লা (জন্ম: ৫৭০ হিজরী)
৬.৩ ইবনে আল-জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী)
৬.৪ আবূ আল-খাত্তাব বিন দিহইয়া আল-কালবী (৫৪৪-৬৩৩ হিজরী)
৬.৫ শামস আল-দীন আল-জাযারী (বেসাল: ৬৬০ হিজরী)
৬.৬ ইমাম আবূ শামা (৫৯৯-৬৬৫ হিজরী)
৬.৭ ইমাম সদর আল-দীন মাওহুব বিন উমর আল-জাযারী (বেসাল: ৬৬৫ হিজরী)
৬.৮ ইমাম যাহির আল-দীন জা’ফর আল-তাযনাতী (বেসাল: ৬৮২ হিজরী)
৬.৯ ইবনে তাইমিয়্যা (৬৬১-৭২৮ হিজরী)
৬.১০ ইমাম আবূ আবদ-আল্লাহ বিন আল-হাজ্জ আল-মালেকী (বেসাল: ৭৩৭ হিজরী)
৬.১১ ইমাম শামস আল-দীন আল-যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হিজরী)
৬.১২ ইমাম কামাল আল-দীন আল-আদফাউয়ী (৬৮৫-৭৪৮ হিজরী)
৬.১৩ তকী আল-দীন আবূ আল-হাসান আল-সুবকী (৬৮৩-৭৫৬ হিজরী)
৬.১৪ ইমাদ আল-দীন বিন কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিজরী)
৬.১৪.১ আবূ সাঈদ আল-মুযাফফর (সুলতান গাযী সালাহউদ্দীনের ভায়রা) কর্তৃক উদযাপিত মওলিদুন্নবী (দ:)
৬.১৫ বুরহান আল-দীন বিন জামা’আ (৭২৫-৭৯০ হিজরী)
৬.১৬ যাইন আল-দীন বিন রাজাব আল-হাম্বলী (৭৩৬-৭৯৫ হিজরী)
৬.১৭ ওলী আল-দীন আবূ যুর’আ আল-ইরাক্বী (৭৬২-৮২৬ হিজরী)
৬.১৮ শামস আল-দীন মুহাম্মদ আল-দিমাশকী (৭৭৭-৮৪২ হিজরী)
৬.১৯ ইবনে হাজর আল-আসকালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী)
৬.২০ ইমাম শামস আল-দীন আল-সাখাবী (৮৩১-৯০২ হিজরী)
৬.২১ ইমাম জালাল আল-দীন আল-সুয়ুতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী)
৬.২২ শিহাব আল-দীন আবূ আল-আব্বাস আল-কসতলানী (৮৫১-৯২৩ হিজরী)
৬.২৩ নাসির আল-দীন বিন আল-তাব্বাখ
৬.২৪ জামাল আল-দীন বিন আবদ্ আল-রাহমান অাল-তাত্তানী
৬.২৫ ইমাম ইউসূফ বিন আলী বিন যারিক্ব আল-শামী
৬.২৬ মুহাম্মদ বিন ইউসূফ আল-সালেহী আল-শামী (বেসাল: ৯৪২ হিজরী)
৬.২৭ ইবনে আল-হাজর আল-হায়তামী আল-মক্কী (৯০৯-৯৭৩ হিজরী)
৬.২৮ মুহাম্মদ বিন জার আল্লাহ বিন যাহিরা আল-হানাফী (বেসাল: ৯৮৬ হিজরী)
৬.২৯ কুতুব আল-দীন আল-হানাফী (বেসাল: ৯৮৮ হিজরী)
৬.৩০ মোল্লা আলী ক্বারী (ইন্তেকাল: ১০১৪ হিজরী) কৃত গবেষণা
৬.৩১ মোজাদ্দেদে আলফে সানী (৯৭১-১০৩৪ হিজরী)
৬.৩২ ইমাম আলী বিন ইবরাহীম আল-হালাবী (৯৭৫-১০৪৪ হিজরী)
৬.৩৩ শায়খ আবদ আল-হক্ব মুহাদ্দীস আল-দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী)
৬.৩৪ ইমাম মুহাম্মদ আল-যুরকানী মালেকী (১০৫৫-১১২২ হিজরী)
৬.৩৫ শাহ আবদ আল-রাহীম আল-দেহেলভী (১০৫৪-১১৩১ হিজরী)
৬.৩৬ শায়খ ইসমাঈল আল-হাক্কী (১০৬৩-১১৩৭ হিজরী)
৬.৩৭ শাহ ওলী আল্লাহ মুহাদ্দীস আল-দেহেলভী (১১১৪-১১৭৪ হিজরী)
৬.৩৮ শাহ আবদ আল-আযীয মুহাদ্দীস আল-দেহেলভী (১১৫৯-১২৩৯ হিজরী)
৬.৩৯ আবদ আল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আবদ আল-ওয়াহহাব আল-নজদী (১১৬৫-১২৪২ হিজরী)
৬.৪০ শাহ আহমদ সাঈদ মুজাদ্দেদী আল-দেহেলভী (ইন্তেকাল: ১২৭৭ হিজরী)
৬.৪১ মুফতী মুহাম্মদ এনায়াত আহমদ আল-কাকাওরাউয়ী (১২২৮-১২৭৯ হিজরী)
৬.৪২ আহমদ আলী সাহারানপুরী (ইন্তেকাল: ১২৯৭ হিজরী)
৬.৪৩ সাইয়্যেদ আহমদ বিন যাইনী আল-দাহলান মক্কী (১২৩৩-১৩০৪ হিজরী)
৬.৪৪ আবদ্ আল-হাই লাখনৌভী (১২৬৪-১৩০৪ হিজরী)
৬.৪৫ নওয়াব সিদ্দীক হাসান খাঁন ভূপালী (মৃত্যু: ১৩০৭ হিজরী)
৬.৪৬ হাজ্বী এমদাদউল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (১২৩৩-১৩১৭ হিজরী)
৬.৪৭ নওয়াব ওয়াহিদুজ্জামান (ইন্তেকাল: ১৩৩৮ হিজরী)
৬.৪৮ ইউসূফ বিন ইসমাঈল আল-নাবহানী (১২৬৫-১৩৫০ হিজরী)
৬.৪৯ ড: মুহাম্মদ ইকবাল (১২৯৪-১৩৫৭ হিজরী)
৬.৫০ আশরাফ আলী থানবী (১২৮০-১৩৬২ হিজরী)
৬.৫১ মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানবী (জন্ম: ১৩৪১ হিজরী)
৬.৫২ মুফতী মুহাম্মদ মাযহারউল্লাহ আল-দেহেলভী
৬.৫৩ শায়খ মুহাম্মদ রেযা আল-মিসরী সাহেবের গবেষণা
৬.৫৪ দেওবন্দী মৌলভীদের সর্বসম্মত মত
৬.৫৫ মুসলিম বিশ্বে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ইতিহাস
৬.৫৫.১ মক্কা মোয়াযযমায় মওলিদ উদযাপন
৬.৫৫.১.১ মক্কায় চাক্ষুস সাক্ষীদের বিবরণ
৬.৫৫.২ মদীনা মোনাওয়ারায় মওলিদ উদযাপন
৬.৫৫.৩ মিসর ও পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মওলিদ উদযাপন
৬.৫৫.৪ কাওস এলাকায় মওলিদ উদযাপন
৬.৫৫.৫ আন্দালূসিয়া (স্পেন) ও রোমে মওলিদ উদযাপন
৬.৫৫.৬ ভারত উপমহাদেশে মওলিদ উদযাপন
৬.৫৬ মওলিদ-বিষয়ক তাৎপর্যপূর্ণ লেখনীসমগ্র
সপ্তম অধ্যায়
যে কারণে প্রথম মুসলমান প্রজন্ম মওলিদ পালন করেননি
৭.১ আসহাব (রা:)-বৃন্দের জন্যে মহানবী (দ:)-এর বেসাল শরীফ ছিল চরম বেদনাময়
৭.১.১ দুঃখের সময় প্রকাশ্যে আনন্দ উদযাপনের অনুমতি দেয় না মানব-স্বভাব
৭.২ প্রথম প্রজন্মের খুশি প্রকাশে এই মহাশোক ছিল বড় বাধা
৭.২.১ মহানবী (দ:) হতে বিচ্ছেদ: হযরত আবূ বকর (রা:)-এর বেসালের কারণ
৭.২.২ মহানবী (দ:)-এর বেসালে হযরত উমর (রা:)-এর প্রতিক্রিয়া
৭.২.৩ হযরত ফাতেমাতুয্ যাহরা (রা:)-এর শোক
৭.২.৪ হযরত আনাস বিন মালেক (রা:)-এর শোক
৭.২.৫ হযরত বিলাল বিন রাবাহ (রা:)-এর শোক
৭.২.৬ হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:)-এর শোক
৭.২.৭ হযরত আবদুল্লাহ বিন যায়দ (রা:)-এর শোক ও তাঁর দৃষ্টিশক্তি লোপ
৭.২.৮ আসহাব (রা:)-বৃন্দের শোকের আরো বর্ণনা
৭.২.৯ মহানবী (দ:)-কে সেবাদানকারী প্রাণিদের শোক
৭.৩ রবিউল আউয়াল মাসে খুশি ও শোক সমানভাবে অনুভূত
৭.৪ সময়ের পরিক্রমণে শোকের ওপর খুশির প্রাধান্য বিস্তার
৭.৫ মহানবী (দ:)-এর বেলাদত ও বেসাল উভয়ই রহমতস্বরূপ
৭.৬ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেসাল তাঁর উম্মতের জন্যে সুপারিশের এক উৎসস্বরূপ
৭.৭ কোনো খোদায়ী আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে খুশি হওয়া আল্লাহতা’লারই বিধান
৭.৮ আমরা তাঁর রহমত পেয়েছি, তবে কেন এই দুঃখ?
৭.৯ শেষ বিচার দিবস অবধি মহানবী (দ:)-এর ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিষ্ঠিত
৭.১০ খুশি প্রকাশ কোনো বেদআত নয়: এটা মানবপ্রকৃতি
৭.১১ কোনো ঘটনা/অনুষ্ঠান পালন প্রথম প্রজন্মের সংস্কৃতি ছিল না
৭.১১,১ মদীনায় হিজরত
৭.১১.২ মদীনা সনদ
৭.১১.৩ বদর দিবস
৭.১১.৪ মক্কা বিজয়
৭.১১.৫ শবে কদর: কুরআন নাযেলের রাত
৭.১১.৬ নবযুগে নতুন প্রয়োজন
অষ্টম অধ্যায়
মওলিদুন্নবী (দ:)-এর গঠনাত্মক উপাদান
পরিচ্ছেদ – ১
মাহফিল ও অনুষ্ঠানের আয়োজন
৮.১ মহানবী (দ:) কর্তৃক তাঁরই সৃষ্টির ঘটনা উল্লেখ যা বেলাদতের আগে ঘটেছিল
৮.২ মহানবী (দ:) কর্তৃক তাঁর বেলাদতের স্মরণে সমাবেশের আয়োজন
৮.৩ মহানবী (দ:)-এর গুণ/বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্যের স্মরণে বিশেষ মজলিশের আয়োজন
পরিচ্ছেদ – ২
রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর জীবনী ও গুণাবলী আলোচনা
৮.৪ শরয়ী বিধানের উল্লেখ
৮.৫ নবী পাক (দ:)-এর সহজাত প্রতিভা ও সদাচরণ
৮.৬ মহানবী (দ:)-এর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ
৮.৭ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর চমৎকার গুণাবলী ও অসাধারণত্বের বর্ণনা
৮.৮ তাঁর পবিত্র বেলাদতের বিবরণ ও সেসময় সংঘটিত মহান আধ্যাত্মিক নিদর্শনের উল্লেখ
পরিচ্ছেদ – ৩
মহানবী (দ:)-এর প্রশংসায় না’ত/কসীদা/শে’র/পদ্যের আবৃত্তি
৮.৯ কুরআন মজীদে নিহিত রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাব্যিক প্রশংসা
৮.১০ হুযূর পাক (দ:) নিজেই নিজের প্রশংসাসূচক কবিতা শুনেছেন
৮.১০.১ হযরত হাসান বিন সাবেত (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ
৮.১০.২ হযরত আল-আসওয়াদ বিন সারী’ (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ
৮.১০.৩ হযরত আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ
৮.১০.৪ হযরত আমির বিন আকওয়া (রা:) হতে প্রকাশ্য সমাবেশে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ
৮.১০.৫ হযরত আব্বাস বিন আব্দিল মুত্তালিব (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ
৮.১০.৬ হযরত কা’আব (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ ও তাঁকে আলখাল্লা দান
৮.১০.৭ হযরত নাবিগা আল-জা’দী (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ
৮.১০.৮ মদীনাবাসী মেয়েদের দফ (ঢোল)-সহ প্রশংসাসূচক না’ত পরিবেশন
৮.১০.৯ ইমাম বুসিরী (রহ:)-এর আরোগ্য লাভ ও রাসূল (দ:) হতে উপহারস্বরূপ তাঁরই জুব্বাপ্রাপ্তি
৮.১১. মহানবী (দ:)-এর সম্মানে বন্দনামূলক কাব্য আবৃত্তিকারী সাহাবা (রা:)-বৃন্দের তালিকা
পরিচ্ছেদ – ৪
রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি সালাত-সালাম পাঠ
৮.১২ মহানবী (দ:)-এর প্রতি সালাওয়াত পাঠ আল্লাহরই সুন্নাহ ও বিধান
৮.১৩ সালাত-সালাম প্রেরণের তাৎপর্য
৮.১৪ সালাত-সালামের অনন্ত স্বতন্ত্র মর্যাদা
৮.১৪.১ রাসূল (দ:)-এর প্রতি সালাত-সালামের মাধ্যমেই আল্লাহর কাছে কারো দোয়া কবূল হয়
৮.১৪.২ (নামাযের) তাশাহহুদে সালাত-সালাম
৮.১৪.৩ নামাযের পরে সালাত-সালাম প্রেরণের পক্ষে রাসূল (দ:)-এর নির্দেশ
৮.১৫ সালাওয়াত হুযূর পাক (দ:)-এর কাছে পৌঁছে
৮.১৫.১ সালাত-সালাম হুযূর পাক (দ:)-এর কাছে সরাসরি পৌঁছে
৮.১৫.২ মহানবী (দ:) সরাসরি সালাত-সালাত শোনেন
৮.১৫.৩ হুযূর পাক (দ:) সালাওয়াতের জবাব দেন
৮.১৫.৪ মহানবী (দ:)-এর প্রতি ফেরেশতাবৃন্দ সালাত-সালাম পাঠ করেন
পরিচ্ছেদ – ৫
ক্বিয়াম (দাঁড়াবার রীতি)
৮.১৬ ক্বিয়াম বা দাঁড়াবার রীতি কি শুধু আল্লাহরই জন্যে খাস (সুনির্দিষ্ট)?
৮.১৬,১ নামাযের দাঁড়ানো ও বসা অবস্থাগুলো খোদ এবাদত নয়
৮.১৬.২ দাঁড়ানো অবস্থা যদি এবাদত হয়, তাহলে অন্যান্য অবস্থাগুলো কী হবে?
৮.১৬.৩ নামাযের দাঁড়ানো প্রথা এবাদত হয় কোন্ উপায়ে?
৮.১৭  ক্বিয়াম (প্রথাগত দাঁড়ানো) সুন্নাহ’র আলোকে অনুমতিপ্রাপ্ত
৮.১৮ ক্বিয়ামের শ্রেণিকরণ
৮.১৮.১ ক্বিয়াম লিল্ এসতেক্ববাল বা কাউকে স্বাগত জানাতে দাঁড়ানো
৮.১৮.২ ক্বিয়াম লিল্ মুহাব্বাহ বা ভালোবাসা প্রকাশার্থে দাঁড়ানো
৮.১৮.৩ ক্বিয়াম লিল্ ফারহা বা আনন্দ প্রকাশার্থে দাঁড়ানো
৮.১৮.৪ ক্বিয়াম লিত্ তা’যিম বা সম্মানার্থে দাঁড়ানো
৮.১৮.৪.১ ক্বিয়াম লিল্ এসতেক্ববাল ও ক্বিয়াম লিত্ তা’যিমের মধ্যকার পার্থক্য
৮.১৮.৪.২ মহানবী (দ:)-এর সম্মানার্থে সাহাবা (রা:)-বৃন্দের চর্চিত দাঁড়ানোর প্রথা
৮.১৮.৪.৩ নামায আল্লাহরই জন্যে; এক্বামত রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর জন্যে
৮.১৮.৫ মানুষের মর্যাদার জন্যে দাঁড়ানো (ক্বিয়াম লিল্ একরাম আল-ইনসানি)
৮.১৮.৬ যিকর বা স্মরণের জন্যে দাঁড়ানো (ক্বিয়াম লিয্ যিকর)
৮.১৮.৬.১ মহানবী (দ:)-এর যিকর বা স্মরণ হচ্ছে মহান আল্লাহতা’রই যিকর
৮.১৮.৭ শান্তি ও আশীর্বাদ প্রেরণ করতে দাঁড়ানো (ক্বিয়াম লিস্ সালাত ওয়াস্ সালাম)
৮.১৮.৭.১ সালাতের অর্থ: শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষণ/প্রেরণের প্রার্থনা
৮.১৮.৭.২ সালাত শব্দটির আক্ষরিক/আভিধানিক অর্থ
৮,১৮.৭.৩ সালাত শব্দটির আক্ষরিক অর্থের প্রয়োগ
৮.১৮.৮ মহানবী (দ:)-কে অভ্যর্থনা জানাতে মওলিদে দাঁড়ানো হয় না
৮.১৮.৯ মওলিদে দাঁড়ানোর প্রথা মূলতঃ খুশি প্রকাশের উদ্দেশ্যে
৮.১৮.১০ ক্বিয়ামের প্রতি নিষেধাজ্ঞা: এর কারণসমূহ
পরিচ্ছেদ – ৬  
আলোকসজ্জার আয়োজন
৮.১৯ তারকারাজি আতশবাজির মতো নেমে এসেছিল
৮.২০ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে মক্কা মুয়াযযমায় মোমবাতি জ্বালানো
পরিচ্ছেদ – ৭
খাবার বণ্টন
৮.২১ মানুষদেরকে খাওয়ানোর চমৎকার গুণ সম্পর্কে কুরআন মজীদের বর্ণনা
৮.২২ অন্যদেরকে খাওয়ানোর জন্যে হাদীসে প্রদত্ত উৎসাহ
পরিচ্ছেদ – ৮
মওলিদের জুলূস্ বা মিছিল
পরিচ্ছেদ – ৯
মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বিভিন্ন দিক: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
৯.১ শরীয়তের দিক
৯.১.১ আল্লাহ’র বর্ষিত রহমত-বরকতের স্মরণ
৯.১.২ খাদ্য-ভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন
৯.২ ঐতিহাসিক দিক
৯.৩ সাংস্কৃতিক দিক
৯.৪ নির্দেশনামূলক দিক
৯.৪.১ পিতামাতার মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য
৯.৪.২ চিন্তার খোরাক
৯.৪.৩ ঈমান হেফাযত বা রক্ষার কৌশল
৯.৫ দা’ওয়া বা ধর্মপ্রচারের দিক
৯.৬ উদ্বুদ্ধকরণের দিক
৯.৬.১ আমল বা ধর্ম অনুশীলনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিশেষ দিকসমূহ
৯.৬.২ পুণ্যদায়ক আমলের সারাংশ বা নির্যাস হচ্ছে নবী পাক (দ:)-এর প্রতি ভালোবাসা
৯.৭ আধ্যাত্মিক দিক
দশম অধ্যায়
মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন কি বেদআত?
১০.১ বেদআতের আক্ষরিক অর্থ
১০.১.১ আল-কুরআন হতে এর অর্থ নিশ্চিতকরণ
১০.২ বেদআতের প্রায়োগিক অর্থ
১০.৩ স্থানীয় (লোকজ) সংস্কৃতির প্রতিটি দিক-ই কি বেদআত?
১০.৩.১ আসহাব (রা:)-বৃন্দের সাংস্কৃতিক আচার ও প্রথা
১০.৩.২ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশ
১০.৩.২.১ মীলাদুন্নবী (দ:)-এর জুলূস সংস্কৃতির আওতাধীন
১০.৩.২.২ মহানবী (দ:)-এর প্রতি দাঁড়িয়ে সালাত-সালাম পেশ সংস্কৃতির আওতাধীন
১০.৩.২.৩ মওলিদে সাজানো সংস্কৃতির আওতাধীন
১০.৪ বেদআতের প্রকৃত অর্থ
১০.৪.১ ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন এবং ‘ফাহুয়া রাদ্দ’ বাক্যটির সঠিক উপলব্ধি
১০.৫ ধর্মে নতুন বিষয়ের প্রবর্তন: রাসূল (দ:)-এর যুগে এর উদ্দিষ্ট অর্থ
১০.৬ খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে উদ্ভূত ’মুহদাসাত আল-উমূর’ (নতুন বিষয়াদি)
১০.৬.১ মিথ্যে নুবুওয়্যত আরোপের সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়
১০.৬.২ রিদ্দাহ’র (ধর্মত্যাগের) সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়
১০.৬.৩ যাকাত দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়
১০.৬.৪ খাওয়ারিজদের (খারেজী গোষ্ঠীর) সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়
১০.৬.৪.১ আমাদের যুগে কোনো কিছুকে ’নতুন প্রবর্তিত বিষয়’ (মুহদাসাত আল-উমূর) বলার সঠিক পদ্ধতি কী?
১০.৭ সাহাবা (রা:)-বৃন্দের বর্ণনার আলোকে বেদআতের সংজ্ঞা (ধারণা)
১০.৭.১ আল-কুরআনের সংকলন ও শায়খাইন (প্রথম দুই খলীফা)-এর আচরিত প্রথা
১০.৭.২ জামা’আতে তারাবীহ’র নামায আদায়ের প্রবর্তন
১০.৭.৩ শুক্রবারের জুমু’আর নামাযের আগে দ্বিতীয় আযান
১০.৮ বেদআতের ধারণা এবং কতিপয় সাম্প্রতিককালের উদাহরণ
১০.৮.১ ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন (বা প্রতিষ্ঠা)
১০.৮.২ মসজিদ নির্মাণ
১০.৮.৩ কুরআন মজীদের অনুবাদ ও ব্যাখ্যাকরণ
১০.৯ উলামাদের মতানুযায়ী বেদআতের শ্রেণিবিন্যাস
১০.৯.১ ইমাম আল-শাফেঈ (১৫০-২০৪ হিজরী)
১০.৯.২ ইযয আল-দ্বীন বিন আব্দিস্ সালাম (৫৭৭-৬৬০ হিজরী)
১০.৯.৩ মোল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী (ইন্তেক্বাল: ১০১৪ হিজরী)
১০.৯.৩.১ ’প্রত্যেক বেদআত-ই ভ্রান্তি’ – হাদীসটির সঠিক মর্ম উপলব্ধি
১০.১০ বেদআতের শ্রেণিবিভাগ
১০.১০.১ বেদআতে হাসানা (প্রশংসনীয় নতুন প্রথা)-এর উপ-শ্রেণিসমূহ
১০.১০.১.১ আল-বেদআত আল-ওয়াজিবা বা আবশ্যকীয় নতুন প্রথা
১০.১০.১.২ আল-বেদআত আল-মুস্তাহাব্বা/মুস্তাহসানা তথা প্রশংসনীয় নতুন প্রথা
১০.১০.১.৩ আল-বেদআত আল-মুবাহা বা অবস্থাভেদে বৈধ বলে বিবেচিত নতুন প্রথা
১০.১০.২ দূষণীয় বা মন্দ নতুন প্রথার উপ-শ্রেণিসমূহ
১০.১০.২.১ নিষিদ্ধ নতুন প্রথা (আল-বেদআত আল-মুহাররামা)
১০.১০.২.২ অপন্দনীয় নতুন প্রথা (আল-বেদঅাত আল-মাকরুহা)
১০.১০.৩ হাদীসের আলোকে বেদআত শ্রেণিকরণের প্রামাণ্য দলিল
১০.১১ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ভিত্তি আল-কুরআন ও হাদীস শরীফেই নিহিত
১০.১২ উম্মতে মুহাম্মদীয়্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কোনো ভ্রান্তিতে ঐকমত্য পোষণ করবেন না
১০.১৩ ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী অনুধাবন করা অত্যাবশ্যক
একাদশতম অধ্যায়
মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট মতবাদগত বিষয়াদি
১১.১ মওলিদুন্নবী (দ:) শব্দটির প্রয়োগ
১১.১.১ আরবী ভাষাতত্ত্বের বইপত্রে মীলাদ শব্দটির ব্যবহার
১১.১.২ হাদীস ও সীরাহ (জীবনী)-গ্রন্থাবলীতে মীলাদ শব্দটির ব্যবহার
১১.১.৩ সাহিত্যকর্মে মীলাদ শব্দটির ব্যবহার
১১.২ মওলিদুন্নবী (দ:) খুশির ঈদ, শরীয়তের (বিধি মোতাবেক) ঈদ নয়
১১.৩ মহানবী (দ:)-এর গুণাবলী ও মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বিবরণ প্রদানে মুহাদ্দেসীনবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি
১১.৩.১ কিতাব আল-মানাক্বিবের অধ্যায়গুলো বিন্যাসে ইমাম তিরমিযীর গৃহীত পদ্ধতি
১১.৪ মহানবী (দ:)-এর গুণাবলী ও মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বিবরণ প্রদানে ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি
১১.৫ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর পক্ষে শরীয়তের দলিল দাবি প্রসঙ্গে
১১.৬ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন তওহীদেরই বহিঃপ্রকাশ
১১.৭ মওলিদুন্নবী (দ:) উপলক্ষে অর্থব্যয় করা অপচয় নয়
১১.৮ ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য প্রকাশের আয়োজনসমূহ
১১.৯ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর মাহফিল আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা
১১.১০ যেসব দিক সংস্কারের প্রয়োজন
১১.১১ বাড়াবাড়ি এড়িয়ে চলার আবশ্যকতা
লেখক/গ্রন্থ তালিকা
বর্ণনানুক্রমিক তালিকা
কুরআনের আয়াতের তালিকা
হাদীস ও রেওয়ায়াতের তালিকা
সাধারণ তালিকা
মুখবন্ধ
পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মাঝে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য ও ঐতিহাসিক বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভিব্যক্তি-ই হচ্ছে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন। এটা এমনই এক প্রশংসনীয় আমল (ধর্মীয় অনুশীলন), যা দ্বারা এমন কি আবূ লাহাবের মতো একজন কাফের-ও উপকার পেয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করায় আবূ লাহাবের মতো কট্টরপন্থী কাফেরের শাস্তি যদি প্রতি সোমবার লাঘব করা হয়, তাহলে সেই (মু’মিন) মুসলমানের ক্ষেত্রে কী পুরস্কার বরাদ্দ রয়েছে যিনি সারা জীবন এই দিনটি উদযাপন করে আসছেন?
সৃষ্টির সেরা খোদ মহানবী (দ:)-ই নিজের বেলাদত দিবস সোমবারকে সম্মান করতেন। (আল্লাহর প্রতি) শুকরিয়া জানানোর উদ্দেশ্যে তিনি এই দিনটিতে রোযা রাখতেন, কেননা এই দিনেই তিনি পৃথিবীবাসীর কাছে পরিচিত হয়েছিলেন। এ কাজ করে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের খোদায়ী আদেশ-ই পালন করেছিলেন মাত্র, যেহেতু তাঁর সম্মানিত অস্তিত্বের উপলক্ষেই বিশ্বজগতের সব কিছু সৃষ্টি করা হয়েছিল।
মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন তাতে অংশগ্রহণকারীদের অন্তরে মহাসম্মানিত রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে উৎসাহ যোগায়, যা অন্তরে (তাঁর সান্নিধ্য লাভের) আকাঙ্ক্ষার অনুভূতি জাগ্রত করে। শরীয়ত অনুযায়ী তাঁর প্রতি সালাওয়াত পাঠের আমলটি ব্যাপক সওয়াবের উৎস, আর তাই উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মওলিদ’কে উপকারী আমল হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
মীলাদের সমাবেশগুলো রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সীরাহ (জীবনী) মোবারকের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা নতুন করে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই কারণেই মওলিদের মাহফিলে অন্তর্ভুক্ত থাকে মহানবী (দ:)-এর নবুওয়্যতের অনুকরণীয় আদর্শ, তাঁরই গুণাবলী, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মো’জেযাসমূহের তাযকেরা (স্মরণার্থে আলোচনা) এবং বিবরণ। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে মহানবী (দ:)-এর মহব্বত ও সান্নিধ্য অর্জন এবং প্রত্যেক মু’মিন মুসলমানের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সত্তা তথা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে তাঁদের আত্মিক সম্পর্কের বন্ধন সুদৃঢ়ীকরণ। এটা আপনাআপনি-ই শরীয়তের মূল লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করে। তাঁর গুণাবলী ও পূর্ণতাকে স্বীকার করলে কারো অন্তরে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি এবং রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রেসালাতের প্রতি ঈমান মজবুত হয়। মহানবী (দ:)-কে সম্মান প্রদর্শন হচ্ছে ঈমানের সর্বপ্রথম মৌলিক প্রয়োজনীয় শর্ত।
মওলিদুন্নবী (দ:)-এর মাধ্যমে প্রকাশিত খুশি, (আল্লাহ’র) যিকিরের মাহফিল অনুষ্ঠান ও মহানবী (দ:)-এর শানে না’ত-কসীদা-সেমা’ আবৃত্তি, এর পাশাপাশি মানুষের মাঝে খাবার পরিবেশন, এসব-ই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি পদ্ধতি। মহানবী (দ:)-কে আমাদের মাঝে প্রেরণ করে মহান আল্লাহতা’লা আমাদেরকে তাঁরই অশেষ, অফুরন্ত রহমত-বরকত-নেয়ামত (মানে আশীর্বাদ) লাভে হক্বদার করেছেন; আর তাই তিনি আমাদের এই সর্বাধিক সেরা পুরস্কারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
আল্রাহতা’লা যেমন রমযান মাসকে কুরআন নাযেলের কারণে অন্যান্য মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ করেছেন, ঠিক তেমনি রবিউল আউয়াল মাসটিও আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়েছে এ মর্মে যে এই মাসে কুরআন মজীদ যিনি আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলেন, সেই মহান সত্তা এই ধরাধামে শুভাগমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য বেলাদত দ্বারাই এই মাসটি অন্যান্য সব মাসের চেয়ে অধিকতর পুণ্যময় হয়েছে।
বস্তুত যে রাতে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (দ:)-এর বেলাদত হয়, সেটা লাইলাতুল ক্বদরের রাতের চেয়েও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। রাইলাতুল ক্বদরে সর্বপ্রথম আল-কুরআন ও ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। কিন্তু হুযূর পূর নূর (দ:), যাঁর অন্তরে আল-কুরআন নাযেল হয়, তিনি না হলে আমরা কোনো ঐশী শাস্ত্রলিপি পেতাম না, লাইলাতুল ক্বদর-ও পেতাম না, কিংবা খোদ দ্বীন ইসলাম-ও পেতাম না। এসব নেয়ামত হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমেই কেবল অর্জিত হয়েছে। অতএব, তাঁর বেলাদতের রাতটি লাইলাতুল ক্বদরের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
আল্লাহতা’লা মানবজাতির প্রতি তাঁর অগণিত ও সীমাহীন রহমত-বরকত ও নেয়ামত দান করেছেন। এসব আশীর্বাদ অসংখ্য এবং এগুলো চিরকাল বর্ষিত হতে থাকবে। প্রতিটি নেয়ামত অপর যে কোনো নেয়ামতের মতোই বড়। এতদসত্ত্বেও সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা নিজের আশীর্বাদগুলো সম্পর্কে গর্ব করেন না। তিনি আমাদের স্বাদগ্রহণের জন্যে আহার্যের এক বিশাল তালিকা মঞ্জুর করেছেন, কিন্তু তিনি তাঁর এই দান স্মরণ করেন না। তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের পানীয় দ্রব্য দ্বারা সতেজ রেখেছেন, কিন্তু নিজের এই দান সম্পর্কে কোনো গর্ব তিনি করেন না। রাত ও দিনের আবর্তমান চক্রের সুবাদে আমাদের সময় সুনিয়ন্ত্রিত হওয়ার দরুন আমরা বিশ্রাম নিতে পারি এবং জীবনের নানা চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হই; আসমান, জমিন ও দরিয়া, এসব কিছুকেই আমাদের অধীনস্থ করে দেয়া হয়েছে; আমাদেরকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ তথা আল্লাহতা’লার সেরা সৃষ্টি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে এবং সম্মান ও মর্যাদা-ও মঞ্জুর করা হয়েছে, কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর এসব দান স্মরণ না। আমাদেরকে পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা আশীর্বাদধন্য করা হয়েছে; এই বিশ্বজগতের বিশাল ও বিস্তৃত প্রান্তসীমা হতে আরম্ভ করে আমাদের অন্তর্নিহিত সত্তার গভীরে এমন নেয়ামত আমাদের প্রতি মঞ্জুর করা হয়েছে, যা আমাদের মস্তিষ্কের উপলব্ধিরও অতীত; অথচ বিশ্বজগতের প্রভু (’রাব্বুল ‘আলামীন’) হওয়া সত্ত্বেও সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর এ অনুগ্রহ ও আশীর্বাদের গর্ব করেন না। তবে বিশ্বমানবতার জন্যে এমন এক আশীর্বাদ আল্লাহ পাক মঞ্জুর করেছেন, যাঁর খাতিরে তিনি প্রকাশ্য ও স্পষ্টভাবে নিজের করুণা, আশীর্বাদ ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করেন। তিনি ঈমানদার মুসলমানদেরকে এব্যাপারে সচেতন করেছেন এই বলে:
“নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের প্রতি যে তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের প্রতি তাঁর (খোদার) আয়াতসমূহ পাঠ করেন, আর তাদেরকে কিতাব (আল-ক্বুরআন) ও হিকমত (ইসলামী আধ্যাত্মিক জ্ঞান) শিক্ষা দান করেন, অথচ তারা (ঈমানদার মুসলমানবৃন্দ) নিশ্চয় এর আগে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিল” [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (রহ:) কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]
দ্বীন-ইসলামে আল্লাহতা’লার প্রতি তাঁরই প্রদত্ত আশীর্বাদের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা খেদমতের একটি নিদর্শন মাত্র। এর যৌক্তিকতা আল-ক্বুরআনে উল্লেখিত হয়েছে এভাবে –
“এবং স্মরণ করো, যখন তোমাদের রব্ব শুনিয়ে দিলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি তোমাদেরকে আরো অধিক দান করবো এবং যদি অকৃজ্ঞ হও, তবে আমার শাস্তি কঠোর” [আল-ক্বুরআন, ১৪:৭]।
এই আয়াতটি ব্যাখ্যা করে যে খোদাতা’লার নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ফলশ্রুতিতে আরো অতিরিক্ত আশীর্বাদ লাভ সম্ভব হয়। খোদায়ী নেয়ামতের প্রতি শুকরিয়া আদায় করাটা এই উম্মতের জন্যে খাস বা সুনির্দিষ্ট নয়, বরং এটা পূর্ববর্তী উম্মাতগুলোর প্রতিও আরোপ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বনূ ইসরাঈল (ইহুদী) সম্প্রদায় যে আশীর্বাদের কারণে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর ওপরে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল এবং ফেরাউনের জুলুম-অত্যাচার হতে মুক্তি পেয়েছিল, সেটা সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে:
“এবং স্মরণ করো, যখন আমি তোমাদেরকে ফের‘আউনী সম্প্রদায় থেকে নিষ্কৃতি দান করেছি, যারা তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিতো, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করতো আর তোমাদের কন্যাদেরকে জীবিত রাখতো; এবং এর মধ্যে তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে এক মহা ‘বালা’ নিহিত ছিল (অথবা ছিল এক মহা পুরস্কার)” [আল-ক্বুরআন, ২:৪৯]।
এই আয়াতে করীমা ব্যাখ্যা করে যে দাসত্ব থেকে মুক্তি এমনই এক মহা নেয়ামত যার দরুন এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্যেও অত্যাবশ্যক হয়। এর থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, কোনো জাতির মুক্তি অর্জন খোদাতা’লারই দানকৃত একটা উপহার যেটার শোকর-গুজারী করা বাধ্যতামূলক। এই আয়াতটি সাক্ষ্য দেয় এ বাস্তবতার যে, সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে খোদায়ী নেয়ামতের মূল্যায়ন ও খুশি উদযাপন করা জরুরি, যাতে পরবর্তীকালে আগত প্রজন্মগুলো এই আশীর্বাদের মূল্য অনুধাবন করতে পারে এবং এর গুরুত্ব-ও উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।
মানুষ সাধারণতঃ সারা বছরই আল্লাহতা’লার আশীর্বাদগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে; তবুও সময়ের পরিক্রমণে সমগ্র উম্মাহকে আল্লাহর মঞ্জুরিকৃত কোনো তাৎপর্যপূর্ণ দিন আগমন করলে এর খুশির বহিঃপ্রকাশ আপনাআপনি সামষ্টিক উদযাপনে রূপ নেয়। কুরআন মজীদে বর্ণিত আছে যে বনূ ইসরাঈল বংশকে ফেরাউনের অত্যাচার-নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার পর এবং নীল-নদের স্রোত পার হয়ে নিরাপদে সিনাই উপত্যকায় তাদের প্রবেশের পর তারা মারাত্মক গরম আবহাওয়া ও খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যার দরুন তাদেরকে ছায়া দেয়ার জন্যে মেঘ পাঠানো হয়। এটা এমন-ই এক আশীর্বাদ ছিল যে আল-কুরআনে এ সম্পর্কে বিবৃত হয়:
“এবং (স্মরণ করো) আমি তোমাদের ওপর মেঘকে ছাউনি করেছি (তিহা উপত্যকায়), আর তোমাদের প্রতি ‘মান্না’ ও ’সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছি” [সূরা বাক্বারা, ৫৭ আয়াত]।
ক্বুরআন পাকের অনেক জায়গায় সুনির্দিষ্ট রহমত-বরকত সম্পর্কে উল্লেখ করার সময় (রহমত বর্ষণের) ওইসব দিনের স্মরণার্থে খুশি উদযাপন করার বিধান আল্লাহতা’লা জারি করেছেন। পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর অনুশীলিত রীতিও ছিল এটাই। পয়গম্বর ঈসা (আ:) তাঁর উম্মতের জন্যে আসমানী খাদ্য-খাঞ্চা প্রার্থনাকালে আরয করেন এভাবে:
“মরিয়ম-তনয় ঈসা আরয করলেন, ‘হে আল্লাহ, হে আমাদের রব্ব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে একটা খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের জন্যে ঈদ হবে – আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে; এবং আপনার কাছ থেকে (তা হবে) নিদর্শন” [আল-ক্বুরআন, ৫:১১৪]।
পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর বাস্তব উদাহরণের আলোকে ক্বুরআন মজীদের এই আয়াতটিতে আমাদের সামেনে একটি স্পষ্ট ধারণা ব্যক্ত করা হয়েছে এই মর্মে যে, খোদায়ী নেয়ামত (মানে ঐশী আশীর্বাদ) যে দিনে অবতীর্ণ হয় সেদিনটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিবস হিসেবে উদযাপিত হওয়া উচিত। আয়াতটি আরো ইঙ্গিত করে যে কোনো নির্দিষ্ট আশীর্বাদপ্রাপ্তি উপলক্ষে খুশি প্রকাশ শুধু সেসব মানুষ-ই করে থাকেন, যাঁরা ওই আশীর্বাদ যে পয়গম্বর (আ:)-এর প্রতি মঞ্জুর হয়েছে তাঁর সাথে (আত্মিকভাবে) সংশ্লিষ্ট।
আল্লাহতা’লার নেয়ামতপ্রাপ্তির প্রতি খুশি প্রকাশের পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সাধারণ পদ্ধতি হলো, অন্য সবার সামনে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার আশীর্বাদগুলোর বিবরণ প্রদান করা। তাঁর প্রতি এভাবে শুকরিয়া জানানো কুরআন মজীদ হতেও প্রমাণিত, যেমনটি এরশাদ হয়েছে:

“এবং আপন রব্বের নি’মাতের খুব চর্চা করুন (হে রাসূল)!” [আল-কুরআন, ৯৩:১১]
প্রথমে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার দানকৃত নেয়ামত ও আশীর্বাদ স্মরণের ব্যাপারে আজ্ঞা জারি হয়, যেক্ষেত্রে ওই আশীর্বাদকে অন্তর ও জিহ্বা দ্বারা স্মরণ করা চাই; কিন্তু এই স্মরণ অন্য কারো জন্যে নয়, কেবল সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লারই জন্যে নির্দিষ্ট। অতঃপর এই আশীর্বাদটি উল্লেখ করার বিধান দেয়া হয়েছে, যার দরুন কেউ অন্যান্যদের উপস্থিতিতে এই আশীর্বাদ সম্পর্কে প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন এমনভাবে যাতে এর তাৎপর্য মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, এই স্মরণ (যিকর) একদিকে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার সাথে সংশ্লিষ্ট,অপরদিকে তা উল্লেখ করা (তাযকেরা) সৃষ্টির সাথে সংশ্লিষ্ট, যাতে অনেক মানুষ এই স্মরণ করার কাজে ব্যাপৃত হতে পারে। কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে:
“সুতরাং আমার স্মরণ করো, আমিও তোমাদের চর্চা করবো, আর আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” [সূরা বাক্বারা, ১৫২ আয়াত]
আরেক কথায়, তোমরা আমার নেয়ামতগুলো (ব্যক্তি পর্যায়ে) স্মরণ করো না, বরঞ্চ এমন কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপক পরিবেশে তা উল্লেখ করো যার দরুন মানুষেরাও তা শোনতে পায় এবং জানতে পারে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বাড়তি পন্থা হচ্ছে ঈদের আকারে খুশি উদযাপন করা। পূর্ববর্তী উম্মতগুলো যেদিনটিতে কোনো বিশেষ নেয়ামত লাভ করতেন, সেদিনটি তারা ঈদ হিসেবে উদযাপন করতেন। কুরআন মজীদ হযরত ঈসা (আ:)-এর দোয়া সম্পর্কে বর্ণনা দেয় এভাবে:
“মরিয়ম-তনয় ঈসা আরয করলেন, ‘হে আল্লাহ, হে আমাদের রব্ব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে একটা খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের জন্যে ঈদ হবে – আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে; এবং আপনার কাছ থেকে (তা হবে) নিদর্শন” [আল-ক্বুরআন, ৫:১১৪]।
এ আয়াতে খাদ্য-খাঞ্চার মতো একটি অস্থায়ী আশীর্বাদ লাভকে ঈদের দিন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এমন কি আজো খৃষ্টান সম্প্রদায় রোববারকে অশীর্বাদপ্রাপ্তির দিন হিসেবে পালন করে থাকেন। খাদ্য-খাঞ্চা প্রেরণের আশীর্বাদ কি কোনো পয়গম্বর প্রেরণের নেয়ামতের সমতুল্য? ওই ধরনের অগণিত আশীর্বাদ-ই তো আমাদের মহাসম্মানিত রহমত (করুণা) ও আশীর্বাদ হযরতে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের খাতিরে বিসর্জন দেয়া যেতে পারে।
সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে, জনৈক ইহুদী একবার হযরত উমর ফারূক (রা:)-কে বলেন যে আল-কুরআনের [“আজ তোমাদের দ্বীন (ধর্ম)-কে তোমাদেরই জন্যে পূর্ণ করলাম”] আয়াতটি যদি তৌরাতে প্রকাশিত হতো, তাহলে ইহুদী সম্প্রদায় ওই দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করতো। হযরত উমর (রা:) এ কথার উত্তরে বলেন যে আয়াতটি কোন্ দিনে এবং কোথায় অবতীর্ণ হয়েছিল তা তাঁর স্মরণে আছে: সেটা ছিল আরাফাতের ময়দানে হজ্জ্বের দিন, অধিকন্তু শুক্রবার (উভয় দিন-ই ঈদস্বরূপ)। [আল-বুখারী কৃত সহীহ; কিতাবুল ঈমান, ‘ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস’ অধ্যায়, ১:২৫ #৪৫; মুসলিম কৃত সহীহ: কিতাব আল-তাফসীর, ৪:২৩১৩ #৩০১৭; আল-তিরমিযী প্রণীত আল-জামিউস্ সহীহ: আবওয়াব তাফসীর আল-কুরআন (কুরআন তাফসীরের অধ্যায়গুলো), অধ্যায়: ‘সূরা আল-মা’য়েদা’, ৫:২৫০ #৩০৪৩; এবং আল-নাসাঈ রচিত আল-সুনান: কিতাব আল-ঈমান, ‘ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি’ অধ্যায়, ৮:১১৪ #৫০১২]
একটি প্রশ্ন: যদি ধর্মকে পূর্ণতাদানের বাণী বহনকারী আয়াতে করীমা অবতীর্ণ হওয়ার দিনটি ঈদ হিসেবে গণ্য হতে পারে, তাহলে মানবতার চূড়ান্ত কল্যাণকারী যেদিন ধরাধামে শুভাগমন করেন সেদিনটি কেন ঈদ হিসেবে পরিগণিত হবে না? এই জিজ্ঞাসা শুক্রবার দিনের মর্যাদাময় বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের চিন্তার খোরাকও যোগায়।
মহানবী (দ:)-এর হাদীস শরীফেও উল্লেখিত হয়েছে যে তিনি তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন দিবস উদযাপন উপলক্ষে ছাগল কুরবানী করতেন এবং এর গোস্ত অতিথিদের মাঝে বিতরণ করতেন। হযরত আনাস (রা:)-এর মতানুযায়ী, আম্বিয়াকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর নবুওয়্যত ঘোষণার পর আকীকা (নবজাতক শিশুর জন্যে কৃত পশু কুরবানী) পালন করেন। ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী সাল) এই রেওয়ায়াতটিকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে প্রদর্শন করে যুক্তির অবতারণা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব হুযূরে পাকের (দ:) বেলাদতের সপ্তম দিনে তাঁর আকীকা পালন করেছিলেন, আর আকীকা জীবনে একবার পালন করাই আবশ্যকীয়। অতএব, এটা স্পষ্ট যে মহানবী (দ:)-এর আমলটি আকীকা ছিল না, বরঞ্চ তা ছিল আতিথেয়তা যা তিনি তাঁরই বেলাদতের স্মরণে পালন করেছিলেন। [এই গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে]
রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো খোদায়ী আশীর্বাদ কল্পনা করা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। এ উপলক্ষে যে স্পষ্ট আনন্দ ও সুখ ব্যক্ত হয়েছে, তা ঐতিহাসিক বিবরণসমূহ হতে জানা যায়। নবুওয়্যতের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যবিষয়ক বইপত্রে এমন প্রচুর উদাহরণ বিদ্যমান, যেখানে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর মাহবূব (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ ও সুখ অনুভব করেন।
যে বছর মহানবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত শরীফ (মানে ধরাধামে শুভাগমন) হয়, সেই পুরোটা বছর জুড়ে অনেক আশ্চর্যজনক ও ব্যাখ্যার অতীত বাস্তব ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করা হয়। ওই আশীর্বাদধন্য (বেলাদতের) সময়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার বর্ষিত বিশেষ রহমত তথা করুণা, যার জন্যে সমগ্র বিশ্বজগত অধীর আগ্রহে শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত অপেক্ষারত ছিল, অবশেষে যখন সেই নির্ধারিত শুভমুহূর্ত উপস্থিত হলো তখন বিশ্বজগতের স্রষ্টা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা এই ধরণীর বুকে প্রকাশ করলেন তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যমণিকে; আর তিনি (মহান প্রভু) এমন নূর (জ্যোতি) বিচ্ছুরণের প্রদর্শনী দিলেন যে পূর্ব হতে পশ্চিম দিগন্ত অবধি আলোয় আলোকিত হলো।
হযরত উসমান বিন আবি আল-আস্ (রহ:) বলেন যে তাঁর মা তাঁকে জানিয়েছিলেন:
“রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর পবিত্র বেলাদতের সময় আমি (মা) আমিনা’র কাছে উপস্থিত ছিলাম। ওই মুহূর্তে আমি দেখতে পেলাম তারকারাজি এতো কাছে চলে এসেছে যে (মনে হলো) সেগুলো বুঝি আমার ওপরই পতিত হবে। অতঃপর হুযূরে পাকের (দ:) বেলাদত শরীফ হলে (মা) আমিনা হতে এমন এক জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়, যার দরুন আমরা যে ঘরে ছিলাম সেটা এবং আশপাশের এলাকা আলোকিত হয়ে যায়। এমতাবস্থায়, আমি তাকিয়ে ওই নূর ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুই দেখতে পাইনি।” [ইমাম মুহাম্মদ শায়বানী (রহ:) কর্তৃক নিজ ‘আল-আহাদ ওয়াল-মাসা’নী’ গ্রন্থে বর্ণিত, ৬:২৯ #৩২১০ (উম্মে উসমান বিন আবি আল-’আস হতে গৃহীত); আত্ তাবারানী (রহ:) কৃত ‘আল-মু’জাম আল্-কবীর’, ২৫:১৪৭ ও ১৮৬, #৩৫৫ ও ৪৫৭; আল-মাওয়ার্দী প্রণীত ‘আ’লম আল-নবুওয়্যাহ’, ২৪৭ পৃষ্ঠা; আত্ তাবারী রচিত ‘তারিখ আল-উমাম ওয়াল-মুলুক’, ১:৪৫৪; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘দালায়েল আল-নবুওয়্যা ওয়াল-মা’রিফা আহওয়াল সাহিব আল-শরী’আ’, ১:১১১; আবূ নু’য়াইম কৃত ‘দা’লায়েল আল-নবুওয়্যা’, ১৩৫ পৃষ্ঠা, #৭৬; ইবনে আল-জাওযী প্রণীত ‘আল-মুতাযাম ফী তারিখ আল-উমাম ওয়াল-মুলুক’, ২:২৪৭; ইবনে আসাকির রচিত ‘তারিখ দিমাশক আল-কবীর’, ৩:৭৯ ও ‘আল-সীরাহ অাল-নববীয়্যা, ৩:৪৬; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া, ২:২৬৪; আল-হায়সামী প্রণীত ‘মজমাউল যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ইদ’, ৮:২২০; ইবনে রাজাব হাম্বলী কৃত ‘লাতা’ইফ আল-মা’আরিফ ফীমা লি-মাওয়াসিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’ইফ, ১৭৩ পৃষ্ঠা; এবং আল-আসক্বালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৬:৫৮৩]
আবূ উমামা (রা:) বর্ণনা করেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে জিজ্ঞেস করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনার বিষয়টির আরম্ভ কীভাবে?” হুযূরে পূর নূর (দ:) উত্তর দেন, “আমি হলাম আমার (আদি)-পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এর দোয়া বা প্রার্থনার (জবাব) এবং হযরত ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত খোশ-খবরী (শুভসংবাদ)। (আমার বেলাদতের সময়) আমার মা (আমিনা) তাঁর (পবিত্র শরীর) থেকে নূরের বিচ্ছুরণ প্রত্যক্ষ করেন, যা সিরিয়া-রাজ্যের প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে।” [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল কর্তৃক নিজ ‘আল-মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণিত, ৫:২৬২ #২২৩১৫; ইবনে হিব্বান তাঁর ‘আল-সহীহ’, ১৪:৩১৩ #৬৪০৪ গ্রন্থে এসব কথার আলাদা একটি এসনাদ-সহ আরো দীর্ঘ একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন; আল-বুখারীও নিজস্ব ‘আল-তারিখ অাল-কবীর‘, ৫:৩৪২ #৭৮০৭/১৭৩৬ পুস্তকে ভিন্ন এসনাদ-সহ আরো দীর্ঘ একটি রেওয়ায়াত লিপিবদ্ধ করেন; ইমাম বুখারী নিজস্ব ‘আল-তারিখ আল-আওসাত’, ১:১৩ #৩৩ বইয়ে পৃথক এসনাদ-সহ আরো দীর্ঘ একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন; ইবনে আবি উসামা রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৮৬৭ #৯২৭; আল-রুয়্যানী কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:২০৯ #১২৬৭; ইবনে আল-জা’দ প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ৪৯২ #৩৪২৮; আল-তায়্যালিসী লিখিত ‘আল-মুসনাদ, ১৫৫ #১১৪০; আল-তারানী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর‘, ৮:১৭৫ #৭৭২৯; আল-তাবারানী কৃত ‘মুসনাদ আল-শা’মিয়্যীন’ ২:৪০২ #১৫৮২; আল-দায়লামী প্রণীত ‘আল-ফেরদাউস বি-মা’সউর আল-খিতাব’, ১:৪৬ #১১৩; আল-লালকাঈ লিখিত ‘এ’তেক্বাদ আহল আল-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আ, ১:৪২২-৩ #১৪০৪; আবূ নুয়াইম রচিত ‘হিলইয়া আল-আউলিয়া ওয়া তাবাক্বাত আল-আসফিয়া’, ৬:৯০; ইবনে আল-জাওযী কৃত ‘আল-মুনতাযাম ফী তারিখ আল-মুলুক ওয়াল-উমাম’, ২:২৪৮; ইবনে আসাকির প্রণীত ‘আল-সীরাহ আল-নববীয়্যা’, ১:১২৭; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া‘, ২:২৭৫, ৩০৬ ও ৩২২; আল-হায়সামী তাঁর রচিত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৮:২২২ গ্রন্থে বলেন যে ইমাম আহমদ (রহ:) এটা হাসান (সহীহ) তথা নির্ভরযোগ্য সনদ-সহ বর্ণনা করেছেন; এবং আল-সৈয়ুতী কৃত ‘কেফায়াত আল-তালেব আল-লাবিব ফী খাসায়েস আল-হাবীব’, ১:৭৯]
মা আমিনা (রা:) তাঁর প্রিয় পুত্রের বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের সাথে সম্পর্কিত (অলৌকিক) ঘটনাবলীর ব্যাপারে বলেন:
সৃষ্টিকুল শিরোমণি প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত হলে তাঁর সাথে একটি নূর (জ্যোতি) এমনভাবে বিচ্ছুরিত হয়, যার দরুন পূর্ব হতে পশ্চিমে যা কিছু ছিল সবই আলোকিত হয়ে যায়। [সা’আদ কৃত ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’, ১:১০২; ইবনে জাওযী প্রণীত ‘সাফওয়া আল-সাফওয়া’, ১:৫২; ইবনে আসাকির রচিত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ৩:৪৬; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া’, ২:২৬৪; ইবনে রাজাব হাম্বলী কৃত ‘লাতা’ঈফ আল-মা’আরিফ ফীমা’য়া লি-মাওয়াসিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’ঈফ’, ১৭২ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ুতী প্রণীত ‘কেফা’য়াত আল-তা’লিব আল-লাবীব ফী খাসা’ইস আল-হাবীব’, ১:৭৯; এবং আল-হালাবী রচিত ‘ইনসা’ন আল-’উয়ূন ফী সীরা আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৩]
অন্য এক রেওয়ায়াতে (বিবরণে) মা আমিনা (রা:) নিজের জিসম মোবারক হতে এমন এক নূর বিচ্ছুরণের কথা উল্লেখ করেন, যার দরুন তিনি শাম দেশের বসরায় (বর্তমান ইরাকে) অবস্থিত প্রাসাদগুলো ও বাজার এলাকাগুলো প্রত্যক্ষ করেন; এমন কী তিনি সেখানে চলাচলকারী উটগুলোর গলাও দেখতে পান। [ইবনে সা’আদ কৃত ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’, ১:১০২; আল-তাবারানী প্রণীত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ২৪:২১৪ #৫৪৫; ইবনে হিব্বান রচিত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৩১৩ #৬৪০৪; আবদুর রাযযাক্ক লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৫:৩১৮; আল-দারিমী কৃত ‘আল-সুনান’, ১:২০ #১৩; আল-শায়বানী প্রণীত ‘আল-আহা’দ ওয়াল মাসা’নী’, ৩:৫৬ #১৩৬৯; আল-হাকীম রচিত ‘আল-মুস্তাদরাক’, ২:৬৭৩ #৪২৩০; আল-হায়সামী নিজ ‘মজমা’ আল-যওয়াঈদ’ (৮:২২২) গ্রন্থে জানান যে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও আল-তাবারানী এই বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, আর ইমাম আহমদের বর্ণনার সনদ হচ্ছে হাসান সহীহ; আল-হায়সামী লিখিত ‘মাওয়া’রিদ আল-যামা’ন ইলা’ যাওয়া’ঈদ ইবনে হিব্বা’ন’, ৫১২ #২০৯৩; ইবনে এসহা’ক্ব রচিত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা, ১:৯৭ ও ১০৩; ইবনে হিশা’ম কৃত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ১৬০; ইবনে আসীর প্রণীত ‘আল-কা’মিল ফী আল-তা’রীখ’, ১:৪৫৯; আল-তাবারী লিখিত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল মুলূক’, ১:৪৫৫; ইবনে ’আসা’কির রচিত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ১:১৭১-২; ইবনে ’আসা’কির কৃত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৩:৪৬৬ এবং ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ৩:৪৬; ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-বেদা’য়া ওয়াল-নেহা’য়া’, ২:২৬৪ ও ২৭৫; ইবনে রাজাব হাম্বলী লিখিত ‘লাতা’ঈফ আল-মা’আরিফ ফীমা লি-মাওয়া’সিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’ঈফ’, ১৭৩ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী রচিত ‘কেফা’য়াত আল-তা’লিব আল-লাবীব ফী খাসা’ইস আল-হাবীব’, ১:৭৮; আল-হালাবী কৃত ‘ইনসা’ন আল-’উয়ূন ফী সীরা আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৩; এবং আহমদ বিন যাইনী দাহলা’ন মক্কী প্রণীত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ১:৪৬]

মুহাদ্দেসীন উলামাবৃন্দ (হাদীসশাস্ত্র বিশারদমণ্ডলী) ‘আশূরা’-এর হাদীসগুলোর সাহায্যে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বৈধতা প্রমাণ করেছেন। ‘এয়াওমে আশূরা’ ইহুদী সম্প্রদায় পালন করে থাকেন। এই দিনটিতে পয়গম্বর মূসা (আ:) ও বনূ ইসরাঈল (ইহুদী সম্প্রদায়) ফেরাউনের উৎপীড়ন হতে মুক্তি লাভ করেছিলেন। ফলে এটা তাঁদের স্বাধীনতা/মুক্তি দিবস, যা তাঁরা নিজেদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে রোযা রেখে উদযাপন করতেন। (মদীনায়) হিজরতের পরে মহানবী (দ:) মদীনাবাসী ইহুদীদের দ্বারা এই প্রথা অনুশীলিত হতে দেখে বলেন, “আমি তাদের চেয়ে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর আরো ঘনিষ্ঠ (পয়গম্বর হওয়ার সূত্রে)।” এমতাবস্থায় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রাসূলুল্লাহ (দ:)-ও ‘এয়াওমে আশূরা’তে রোযা রাখা আরম্ভ করেন এবং তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কেও তা অনুসরণ করতে আদেশ করেন। [আল-বুখা’রী কর্তৃক নিজ ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণিত: কিতা’বুস্ সওম (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৯০০; আল-বুখারী লিখিত ‘সহীহ’: কিতাবুল আম্বিয়া (পয়গম্বরবৃন্দের বই), ‘আল্লাহর বাণী: মূসা (আ:)-এর সংবাদ কি তোমাদের কাছে পৌঁছেছে?’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৪৪ #৩২১৬; আল-বুখারী কৃত ‘সহীহ’: কিতা’ব ফাযা’ইল আল-সাহা’বা (সাহাবাবৃন্দের সৎ গুণাবলীর বই), ‘মহানবী (দ:) মদীনায় তাশরীফ নিলে ইহুদীদের তাঁর কাছে আগমন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১৪৩৪ #৩৭২৭; মুসলিম রচিত ‘সহীহ’: কিতা’ব আল-সিয়্যা’ম (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওম আল-আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭৯৫-৬ #১১৩০; আবূ দাউদ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সওম (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওম আল-আশূরা’র রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৩২৬ #২৪৪৪; ইবনে মা’জাহ রচিত কৃত ‘আল-সুনান: কিতাব আল-সিয়্যা’ম’ (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওম আল-আশূরা’র রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫৫২ #১৭৩৪; আহমদ ইবনে হাম্বল লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯১ ও ৩৩৬ #২৬৪৪ ও ৩১১২; এবং আবূ এয়া’লা প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৪৪১ #২৫৬৭]   
এ বিষয়ে অসংখ্য বর্ণনা বিদ্যমান, যা থেকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে ইহুদীরা যদি তাদের পয়গম্বর (মূসা আলাইহিস্ সালাম)-এর বিজয় ও মুক্তিতে খুশি প্রকাশ করতে পারেন, তাহলে মুসলমান হিসেবে আমাদেরও মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ব্যাপারে একই রকমের অনুভূতি প্রকাশ করা চাই, আর তা এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে যে বিশ্বজগতের প্রতি খোদায়ী রহমত, অর্থাৎ, ঐশী করুণা (বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বিশ্বমানবতাকে অত্যাচার-অবিচার ও অন্যায় হতে মুক্তি দিতে ধরাধামে শুভাগমন করেছিলেন এই বিশেষ দিনে, যেমনটি আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:
“আর (তিনি) তাদের ওপর থেকে (তাদেরই অবাধ্যতাজনিত) ওই কঠিন কষ্টের বোঝা ও গলার শৃঙ্খল যা তাদের ওপর ছিল, তা নামিয়ে অপসারণ করবেন।” [আল-কুরআন, ৭:১৫৭]  
পরিশেষে, মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের মাস সমাগত হলে কোনো ঈমানদার মুসলমানের কাছে পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় নেয়ামত (আশীর্বাদ) আর কী-ই বা হতে পারে, যখন তিনি অনুভব করেন এর তুলনায় অন্য যে কোনো সুখ একেবারেই অর্থহীন? প্রকৃত সুখ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশের মাঝে নিহিত। আমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এর চেয়ে কম তাৎপর্যপূর্ণ আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞতা ও খুশি প্রকাশ করতে বাধিত হয়েছিলেন, যে নেয়ামতগুলো ছিল কোনো বিশেষ স্থান বা কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। পক্ষান্তরে, এই অনন্ত, অফুরন্ত সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত তথা সর্বাধিক মহিমান্বিত রাসূল (দ:)-এর ধরণীতলে শুভাগমন হচ্ছে সবার জন্যে (ঐশী) করুণা ও কল্যাণের অবিরাম উৎস। অতএব, মুসলমানদেরকে এ উপলক্ষে আবেগ ও খুশির বহিঃপ্রকাশের পাশাপাশি অসীম কৃতজ্ঞতার প্রতিভূ-ও হতে হবে।
আল-কুরআন অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় মানবজাতিকে তাদের প্রতি বর্ষিত আল্লাহতা’লার (খাস্) রহমত (করুণা), বরকত (আশীর্বাদ) ও দয়া তথা মহানবী (দ:)-কে শ্রদ্ধা ও সম্মান করার নির্দেশ দেয়, যিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত আচ্ছন্নকারী অন্ধকার দূর করেন এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও পশুত্বর দেয়াল যা মানুষকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছিল, তা ভেঙ্গে চৌচির করে দেন। আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান:
“এবং নিজেদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, যখন তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ছিল; তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁরই অনুগ্রহক্রমে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছো।” [আল-কুরআন, ৩:১০৩]   
এই ভগ্ন হৃদয়সমূহের জোড়া লাগানোর এবং বিশ্বমানবের সৌভ্রাতৃত্ব অর্জনের চমৎকার নজির ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। অতএব, মহান আল্লাহর মনোনীত জনের ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন ও আল্লাহর প্রতি ঋণী হওয়ার অনুভূতি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটা অন্য যে কোনো অর্জন বা প্রাপ্তির চেয়ে উম্মাহ’র জন্যে বেশি বাধ্যতামূলক হয়েছে।

  • মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

প্রথম অধ্যায়
মওলিদুন্নবী (দ:) ও ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শন: সঠিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের আলোকে
আমাদের আকীদা-বিশ্বাস, ব্যক্তিত্বের উৎকর্ষ ও আধ্যাত্মিক জীবন যিকরের ধারণাকে ঘিরে আবর্তমান, যার অর্থ ‘স্মরণ করিয়ে দেয়া’, ‘স্মরণ করা’ এবং ‘স্মৃতিরক্ষামূলক কর্ম দ্বারা স্মরণীয় করে রাখা (বা উদযাপন করা)’। আমাদের দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ও লেনদেন, কথাবার্তা/ভাষণ, উপলব্ধি এবং আমাদের জীবনের সমস্ত বিষয়-ই সেই জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ যা আমরা অর্জন করেছি এবং নিজেদের মস্তিষ্কে সংরক্ষণ করেছি। এভাবে আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি ধাপ আমাদের স্মৃতিপটে অঙ্কিত হয়েছে, আর এই স্মৃতি-ই আমাদেরকে জীবন চলার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শন করছে। উদাহরণস্বরূপ, কারো সাথে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টি নির্ভর করে ওই ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত আমাদের স্মৃতির ওপর; আর এরই ভিত্তিতে আমাদের আচার-ব্যবহার ও আচরণ গড়ে ওঠে। স্মৃতিশক্তি ছাড়া কোনো বিষয় সম্পর্কেই বিচার-বিবেচনা করা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর নয়; এমন কি আমরা শত্রু হতে মিত্রকে আলাদাভাবে চিনতেও সক্ষম নই। এমতাবস্থায় আমাদের জীবন একদম এলোমেলো, বিক্ষিপ্ত। অতএব, আমাদের সজ্ঞান সচেতনতা আমাদেরই অন্তর্নিহিত স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভরশীল।
১.১ আল-কুরআনের প্রদর্শিত হেদায়াত হিসেবে ‘যিকরের’ তাৎপর্য
মানবজাতির প্রতি দানকৃত আল-কুরআনের হোদায়াত (পথপ্রদর্শন)-এর ভিত্তিস্তম্ভ ‘স্মরণ’ করার (ঐশী) আজ্ঞার ওপরই ভিত্তিশীল। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহতা’লা ও তাঁর সর্বশেষ নবী (দ:)-এর প্রতি ঈমান রাখেন, তাঁকে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার অবতীর্ণ পূর্ববর্তী ও বর্তমান হেদায়াতগুলোতে একযোগে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে:
“এবং তারাই, যারা ঈমান আনে সেটার ওপর, যা, হে মাহবূব, আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে, আর পরলোকের প্রতি (যারা) বিশ্বাস রাখে।” [আল-ক্বুরআন, ২:৪]  
এখানে ‘স্মরণের’ ভিত্তিতে পূর্ববর্তী ধর্মীয় শাস্ত্রলিপিগুলোর স্বীকৃতিকে এবং তৎপরবর্তী পর্যায়ে ওই স্মৃতি নিজের সারা জীবনে সংরক্ষণ করাকে ঈমানের পূর্ণতা লাভের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কেউ যখন কোনো কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্য করে, সে তখন তা করে তারই (মস্তিষ্কে) জমানো তথ্য অনুসারে। ভালোবাসা, ভয়, বিনয় ও সমর্পণের মতো আবেগ আমাদেরই সংরক্ষিত স্মৃতির দ্বারা আকার-আকৃতি পায়। যদিও এগুলো অন্তরের সাথে জড়িত ভাবানুভূতি, তবুও সংঘটিত মানসিক প্রক্রিয়াগুলো না হলে এগুলোর অস্তিত্ব কোনোভাবেই থাকতো না। অতএব, স্মৃতিশক্তি হচ্ছে আল্লাহতা’লার তরফ থেকে এক বড় নেয়ামত তথা আশীর্বাদ।
(মক্কার) মুশরিকদেরকে প্রকৃত বিশ্বাসের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হলে তারা আপন বৈশিষ্ট্যগত উত্তর দিতো, “আমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মকে আঁকড়ে ধরতে পেরে আমরা সন্তুষ্ট।” আরেক কথায়, তারা নিজেদের শেকড় কেটে ফেলতে অনিচ্ছুক ছিল। নিম্নবর্ণিত আয়াতে এই ধরনের অবিশ্বাসীদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে তাদের পূর্বপুরুষরা ভুল পথ বেছে নেয়ার কারণেই লয়প্রাপ্ত হয়েছিল এবং তাই তাদের পূর্ববর্তীদেরকে যে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল, সেই সত্যের দাওয়াত তাদের কবূল করা উচিত। তবে তারা আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ফলশ্রুতিতে নিজেরাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। কুরআন মজীদ এ বিষয়ে ঘোষণা করে:
“অতঃপর আমি (খোদা) তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গিদেরকে স্বীয় এক মহা দয়াস্বরূপ উদ্ধার করেছি এবং যারা আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করতো তাদেরকে নির্মূল করেছি। আর তারা (কখনো) ঈমান গ্রহণকারী হবার ছিল না।” [আল-ক্বুরআন, ৭:৭২]  
এই আয়াতে করীমায় (মক্কার) অবিশ্বাসীদেরকে ‘স্মরণ করিয়ে’ দেয়া হয়েছে যে তাদের পূর্বপুরুষরা ভুল পথ বেছে নিয়েছিল এবং ফলশ্রুতিতে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। অতএব, অবিশ্বাসীরা যেন অবতীর্ণ এই হেদায়াতকে গুরুত্বসহ গ্রহণ করে এবং পূর্ববর্তীদের মতো একই ভুল না করে বসে। অনুরূপভাবে, মুসলমানবৃন্দ-ও পূর্ববর্তী নবী-রাসূল (আ:)-মণ্ডলীর প্রতি অবতীর্ণ ঐশী বাণীর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে বাধ্য রয়েছেন, যেহেতু সেসব ওহী আল-কুরআনেরই অনুরূপ বার্তা বহন করেছিল। তাই কুরআন মজীদকে সত্য বলে স্বীকার করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পূর্ববর্তী ওহীগুলোকে স্বীকার করাও তদনুরূপ।
১.২ পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর দ্বীন (ধর্ম)
আমাদের (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) পূর্ববর্তী পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দকে স্মরণ করা এবং তাঁদের নবুওয়্যতে বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের ঈমানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সঙ্গত কারণেই আল-কুরআন বিভিন্ন আয়াতে ইসলাম ধর্মকে ‘মিল্লাত-এ-ইবরাহীম’ (ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামের ধর্ম) বলে উল্লেখ করেছে। এরশাদ হয়েছে:

১/ “এবং ইব্রাহীমের দ্বীন থেকে কে বিমুখ হবে ওই ব্যক্তি ছাড়া, যে অন্তরের (দিক দিয়ে) নির্বোধ? আর অবশ্যঅবশ্য আমি পৃথিবীতে তাকে মনোনীত করে নিয়েছি; এবং নিশ্চয় তিনি পরকালে আমার খাস্ নৈকট্যের উপযোগীদের অন্তর্ভুক্ত।” [আল-কুরআন, ২:১৩০; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (রহ:)-এর কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’ বাংলা সংস্করণ]
২/ “এবং কিতাবীরা বল্লো, ‘ইহুদী কিংবা খৃষ্টান হয়ে যাও, সঠিক পথ পাবে!’ (হে হাবীব!) আপনি বলুন, ’বরং আমি তো ইব্রাহীমের দ্বীনকেই গ্রহণ করছি, যিনি সব রকমের বাতিল থেকে মুক্ত ছিলেন; আর তিনি তো ছিলেন না মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত’।” [আল-কুরআন, ২:১৩৫]
৩/ “আপনি বলুন, ‘আল্লাহ সত্যবাদী। কাজেই ইব্রাহীমের দ্বীনের ওপর চলো, যিনি প্রত্যেক বাতিল থেকে আলাদা ছিলেন এবং অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না’।” [আল-কুরঅান, ৩:৯৫]
৪/ “এবং ওই ব্যক্তির চেয়ে কার দ্বীন উত্তম, যিনি আপন চেহারা আল্লাহর জন্যে ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি হন সৎকর্মপরায়ণ; এবং (তিনি) ইব্রাহীমের দ্বীনের অনুসরণ করেছেন, যিনি প্রত্যেক বাতিল থেকে পৃথক ছিলেন? এবং আল্লাহ ইব্রাহীমকে আপন ঘনিষ্ঠ বন্ধুস্বরূপ গ্রহণ করেছেন।” [আল-কুরআন, ৪:১২৫]
৫/ “আপনি বলুন, ‘নিশ্চয় আমার রব্ব (প্রভু) আমাকে সোজা (সহজ, সরল) পথ দেখিয়েছেন; সঠিক দ্বীন, ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ, যিনি সমস্ত বাতিল থেকে পৃথক ছিলেন এবং মুশরিক ছিলেন না’।” [আল-কুরআন, ৬:১৬১]
৬/ “অতঃপর আমি আপনার প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি যে ‘ইব্রাহীমের দ্বীনের অনুসরণ করুন, যিনি প্রত্যেক বাতিল থেকে পৃথক ছিলেন এবং মুষরিক ছিলেন না’।” [আল-কুরআন, ১৬:১২৩]
৭/ “এবং আল্লাহর পথে জ্বেহাদ করো যেভাবে করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি দ্বীনের ব্যাপারে কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি; তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের দ্বীন; আল্লাহ তোমাদের নাম ‘মুসলমান’ রেখেছেন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এবং এ ক্বুরআনে, যাতে রাসূল তোমাদের রক্ষক ও সাক্ষী হন এবং তোমরা অন্যান্য লোকদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দাও। সুতরাং নামায ক্বায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধরো। তিনি তোমাদের অভিভাবক – কতোই উত্তম অভিভাবক এবং কতোই উত্তম সাহায্যকারী!” [আল-কুরআন, ২২:৭৮]
আল-কুরআনের ওপরোল্লিখিত আয়াতগুলো প্রত্যেককে পয়গম্বর ইব্রাহীম (আ:)-এর দ্বীনের ওপর অটল, অবিচল থাকতে আদেশ করে। পয়গম্বর ইউসূফ (আ:) কয়েদখানায় তাঁর সাথী দুই জনের স্বপ্নগুলো ব্যাখ্যা করার আগে অনুরূপ ধর্মীয় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন: “এবং আমি আপন পিতৃপুরুষবৃন্দ – ইবরাহীম, ইসহাক্ব, ও ইয়া’ক্বুবের ধর্মকে গ্রহণ করেছি।” [সূরা ইউসূফ, ৩৮ আয়াত]
এই আয়াতে করীমায় পূর্ববর্তী পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের যিকর তথা তাঁদের এবং তাঁদের উম্মতদের বিবরণ স্মরণ করাটা ধর্মের মৌলিক নীতিমালার একটি নীতি হিসেবে প্রণীত হয়েছে; আর এটা আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর অনুশীলিত আচার-ও। আল-কুরআন ঘোষণা করে: “নিঃসন্দেহে, হে মাহবূব! আমি আপনার প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি, যেমন ওহী নূহ ও তাঁর পরবর্তী আম্বিয়াবৃন্দের প্রতি প্রেরণ করেছি।” [আল-কুরআন, ৪:১৬৩]
পূর্ববর্তী উম্মতদের পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর বিবরণগুলো স্মরণ করা এবং হযরত ইবরাহীম (আ:)-এর দ্বীন সম্পর্কে জানার বিষয়টি ঈমানদারদের অন্তর ও মস্তিষ্ককে আলোকোজ্জ্বল করার একটি উৎস। এটা তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
’যিকর’ (স্মরণ) একটি ব্যাপক বিষয়, যার জন্যে (আলাদা) একটা গোটা বই উৎসর্গ করা প্রয়োজন। স্মরণ ( ও উদযাপন) প্রত্যেক মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে প্রভাব ফেলে থাকে, তা অনুধাবন করেই আল-কুরআন আমাদের মনোযোগ সেদিকে আকর্ষণ করে। এই বিষয়ে যিকর তথা স্মরণের সাথে সংশ্লিষ্ট যেসব শব্দ কুরআন মজীদে ব্যবহৃত হয়েছে, তা যাচাই করাটাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে। ‘যিকর’ শব্দটি এই মহাগ্রন্থে আনুমানিক ২৬৭ বার উচ্চারিত হয়েছে, আর এর উদ্দিষ্ট অর্থ – ‘স্মরণ করা’, ‘স্মরণ করানো’ এবং ‘সংরক্ষণ করা’; এটা উপদেশ ও সতর্ক করার বেলায়ও ব্যবহৃত হয়েছে। খোদ আল-কুরআনকেই ‘আল-যিকর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, ‘আল-নিসইয়ান’ শব্দটি কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে যিকরের বিপরীত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, ‘ভুলে যাওয়া’, ‘ভুলে যাওয়ার কারণ হওয়া’, ‘কোনো কিছুকে তাৎপর্যহীন বলে অবহেলা করা’, এবং ‘কোনো কিছুকে পরিত্যাগ করা’। [আল-ফারাহিদী কৃত ‘কিতাবুল আইন‘, ৭:৩০৪-৫; ইবনে মানযূর প্রণীত ‘লিসান আল-আরব’, ১৫:৩২২-৩; এবং ফায়রোয আবাদী, ‘আল-কামূস আল-মুহীত’, ৪:৩৯৮]  
আল্লাহতা’লা মানুষের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে যেসব (ঐশী) শিক্ষা যুগে যুগে প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলোর নির্যাস ছিল এক ও অভিন্ন; তথাপি মনুষ্য হাতের কারসাজিতে বিকৃতি সাধিত হয়ে সেগুলোর মর্মবাণী হারিয়ে গিয়েছিল। কুরআন মজীদ তাই নিজস্ব হেদায়াতকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে আপন বার্তাকে পুনঃ পুনঃ ব্যক্ত করেছে; এমন কি মহাগ্রন্থের অভ্যন্তরে অবস্থিত আদেশ-নিষেধও ঘনঘন পুনর্ব্যক্ত হয়েছে, যদিও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে পাঠকের মস্তিষ্কে তাজা রাখাই উদ্দেশ্য। এ উপায়ে এর তাৎপর্য সম্পর্কে অনুভূতি জাগ্রত হওয়ার উদ্দেশ্যটি সাধিত হয়, যার ফলে এর বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রেও প্রত্যেককে সচেতন করে তোলা হয়।
এটা মনে রেখেই এবাদত-বন্দেগীর বিষয়গুলো কীভাবে নবুওয়্যতের প্রচেষ্টাসমূহের উদযাপনের সাথে সংশ্লিষ্ট, তা পরবর্তী অধ্যায়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। উপরন্তু, তাতে আরো ব্যাখ্যা করা হবে কীভাবে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের জীবনে খুশি-আণন্দ ও দুঃখ-বেদনার ঘটনাগুলো আমাদের মাঝে মানবতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধকে আবার ফিরিয়ে এনে থাকে।
পরিচ্ছেদ – ১
আম্বিয়া (আ:)-এর স্মরণে (যিকরে): পাঁচ ওয়াক্ত নামায
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ভিত্তিতে ১২ই রবিউল আউয়াল শরীফকে উদযাপন করে থাকেন। তাঁরা আপন অাপন পন্থায় বিশ্বজগতের প্রতি (খোদাতা’লার) মহা করুণা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি তাঁদের ধর্মীয় আবেগপূর্ণ ভালোবাসা ও ভক্তি এই দিনে ব্যক্ত করে থাকেন। এধরনের ঘটনার উদযাপন এমন-ই একটি বিষয় যা ইসলামের নিদর্শন হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
ইসলাম ধর্মের ভিত্তিস্তম্ভ নিহিত রয়েছে পাঁচ ওয়াক্ত নামায কায়েম করার মধ্যে। এটা প্রত্যেক মুসলমানের ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও কর্তব্য, আর ঈমানদারি ও অবিশ্বাসের মাঝে পার্থক্যকারী উপাদান-ও। এসব প্রার্থনা মূলতঃ সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরই এক স্মরণীয় উদযাপন, যা আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের দ্বারা বিভিন্ন সময়ে পালন করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ পাক এসব আমলকে এতোই মূল্যায়ন করেছিলেন যে তিনি এই স্বেচ্ছা-প্রণোদিত প্রার্থনাগুলোকে ঐশী আজ্ঞা দ্বারা হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্যে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন।
ইমাম আল-তাহাবী (হিজরী ২২৯-৩৩১ সাল) পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের ব্যাপারে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আয়েশা (রহ:)-এর একটি বক্তব্য বর্ণনা করেন তাঁরই রচিত ‘শারহ মা’আনী আল-আসা’র’ গ্রন্থে, যা’তে তিনি উল্লেখ করেন:
১.৩ ফজরের নামায: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর স্মরণে  
ভোরে (ফজরের ওয়াক্তে) পয়গম্বর আদম আলাইহিস্ সালামের তওবা যখন কবূল করা হয়, তখন তিনি দুই রাক’আত নামায (কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে) আদায় করেন; ফলে এটা ফজর ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়।
১.৪ যোহরের নামায: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মরণে
পয়গম্বর ইবরাহীম আলাইহিস্ সালাম দুপুরে তাঁর পুত্র পয়গম্বর এসহাক্ব আলাইহিস্ সালামের জন্ম দ্বারা আশীর্বাদধন্য হলে চার রাক’আত নামায আদায় করেন; ফলে এটা যোহর ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়।
১.৫ আসরের নামায: পয়গম্বর উযায়র (আ:)-এর স্মরণে
পয়গম্বর উযায়র আলাইহিস্ সালামকে এক ’শ বছর পরে পুনরুত্থিত করে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘কতোকাল তুমি এই অবস্থায় ছিলে?’ তিনি আরয করেন, ‘একদিন বা তার কিয়দংশ।’ অতঃপর তিনি চার রাক’আত নামায (শোকরানা) নামায আদায় করেন। এটাই ’আসর ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়।
১.৬ মাগরেবের নামায: পয়গম্বর দাউদ (আ:)-এর স্মরণে
বর্ণিত আছে যে সর্ব-পয়গম্বর উযায়র (আলাইহিস্ সালাম) ও দাউদ (আলাইহিস্ সালাম)-কে সূর্যাস্তের সময় ঐশী ক্ষমা মঞ্জুর করা হয়। তাঁরা চার রাক’আত নামায আদায় করার নিয়্যত করেছিলেন, কিন্তু (শারীরিক) দুর্বলতা বা ক্লান্তির কারণে তৃতীয় রাক’আত-শেষে বসে থাকেন (নামায পুরোপুরি সম্পন্ন করতে অক্ষম হয়ে)। ফলে এটা মাগরেব ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়, যা তিন রাক’আতবিশিষ্ট।
১.৭ ’এশার নামায: মহানবী (দ:)-এর স্মরণে
’এশা’র নামায, যেটা দিনের সর্বশেষ প্রার্থনা, সেটা যিনি সর্বপ্রথম আদায় করেন তিনি হলেন আমাদের মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম। [ইমাম আল-তাহাবী কৃত ‘শারহ মা’আনী আল-আসা’র’: কিতাব আস্ সালাহ (নামাযের বই), অধ্যায়: ‘মধ্য প্রার্থনা তথা নামায’, ১:২২৬ #১০১৪]
এই দুই এবং চার রাক’আত নামায, যেগুলো সম্মানিত পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দ কর্তৃক আল্লাহতা’লার দয়া ও করুণার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আদায় করা হয়েছিল, সেগুলো তাঁদের নবুওয়্যত (প্রচার-প্রতিষ্ঠার) মিশন বাস্তবায়ন  প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ স্মরণের আমলস্বরূপ বিবেচিত হয়েছে। ফলে আল্লাহতা’লা এসব নামাযের মাধ্যমে সারাটা দিন আমাদেরকে তাঁরই নবী-রাসূল (আ:)-মণ্ডলীর স্মৃতি নিয়মিতভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
একই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে আবেদীন শা’মী (১২৪৪-১৩০৬ হিজরী) তাঁর রচিত ‘রাদ্দ আল-মোহতার ‘আলা দুর্র আল-মোখতার’ গ্রন্থে লিখেন:
কথিত আছে, ফজরের নামায পয়গম্বর আদম (আ:)-এর; যোহর পয়গম্বর দাউদ (আ:)-এর; আসর পয়গম্বর সোলাইমান (আ:)-এর; মাগরেব পয়গম্বর এয়া’ক্বুব (আ:)-এর; আর ‘এশা পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর; অতঃপর এসব নামাযের সবগুলো এই উম্মতের জন্যে একত্রিত করা হয়েছে। [ইবনে আবেদীন, রাদ্দ আল-মোহতার ‘আলা দুর্র আল-মোখতার ‘আলা তানউইর আল-আবসার, ১:৩৫১]
এই পবিত্র মুহূর্তগুলো, যেগুলোতে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ তাঁদের প্রভু খোদাতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা, বিনয় ও সমর্পণের (আত্মিক) অবস্থায় ছিলেন, সেগুলোকে তিনি (বাধ্যতামূলক) এবাদত-বন্দেগী হিসেবে ঐশী বিধান জারি করেন; যে বিধান সর্বশেষ পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের এই উম্মতের জন্যে আল্লাহ পাকের নৈকট্য ও তাঁরই অসীম করুণা অর্জনের এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই প্রসিদ্ধ আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মকবূল তথা (আল্লাহর দরবারে) গ্রহীত এসব এবাদত-বন্দেগী আমাদের মহানবী (দ:)-এর মধ্যস্থতায় এই উম্মতের প্রতি চিরকাল স্মরণ করার আমল হিসেবে মঞ্জুর করা হয়েছে। ধর্মীয় বিষয়াদিতে যিকর তথা স্মরণ করার গুরুত্বের ব্যাপারে এর চেয়ে আর বড় প্রমাণ কী হতে পারে এই মর্মে যে, ইসলামের বুনিয়াদি স্তম্ভগুলোর মধ্যে মৌলিক একটি স্তম্ভ, অর্থাৎ, পাঁচ ওয়াক্ত নামায-ই হচ্ছে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের যিকর-তাযকেরা’র ব্যবহারিক এক বহিঃপ্রকাশ?
অতএব, পরিশেষে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে যিকর-তাযকেরা’র আমল বা ঘটনা যেগুলো আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছে, সেগুলো কেবল অনুমতিপ্রাপ্ত-ই নয়, বরং সেগুলো ইসলামী চিন্তা-ভাবনা ও দর্শনেরই মৌলভিত্তি। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন আল্লাহতা’লার মাহবূব (প্রেমাস্পদ) ও সেরা সৃষ্টি এবং আম্বিয়াকুল শিরোমণি হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ধরাধামে শুভাগমনের স্মরণ বৈ কিছু নয়। এটা এমন-ই এক উদযাপনের নজির যা পুরোপুরি জায়েয এবং আল্লাহতা’লার ঐশী বিধানের সাথে সম্পূর্ণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
পরিচ্ছেদ – ২
আম্বিয়া (আ:)-এর স্মরণে (যিকরে): হজ্জ্বের বিভিন্ন রীতি ও প্রথা
ঈমানের ঘোষণা ও নামাযের পরে হজ্জ্ব হলো ইসলাম ধর্মের তৃতীয় ভিত্তিস্তম্ভ। হজ্জ্বের মৌলিক বাধ্যবাধকতা এবং এর প্রথাগুলো বাস্তবিকপক্ষে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:), পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) ও মা হাজেরা (রা:)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া শৌর্যবীর্যময় ঘটনাগুলোরই উদযাপন।
এই দুই আম্বিয়া (আ:) ও মা হাজেরা (রা:)-এর অটল, অবিচলভাব, নিরন্তর সাধনা ও ত্যাগের স্মৃতি বজায় রাখতে আল্লাহতা’লা উম্মতে মুহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি এগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় এবাদত-বন্দেগী হিসেবে আদেশ করেছেন। পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান এসব সাধনাকে স্মরণ করতে প্রতি বছর (হজ্জ্বের মওসূমে) মক্কা মোয়াযযমায় সমবেত হন এবং এরই ফলশ্রুতিতে আল্লাহতা’লার রেযামন্দি (সন্তুষ্টি) হাসিল করেন। আল্লাহতা’লা তাঁর আশীর্বাদধন্য প্রিয় বান্দাদের একনিষ্ঠ ও পরম ভালোবাসাপূর্ণ এই ভক্তিমূলক আমল (পুণ্যদায়ক কর্ম)-গুলোর স্মৃতিকে চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করেছেন এবং তিনি ঘোষণা করেছেন যে এগুলো তাঁরই নিদর্শন (আয়াত)।
মক্কা মোয়াযযমায় অবস্থিত পবিত্র কা’বা শরীফ মসজিদচত্বরে প্রবেশ করলে (অন্তরে) ভক্তি ও প্রেম জাগ্রত হয় এবং অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরে, যার ফলশ্রুতিতে অন্তরের প্রশান্তি দেখা দেয়। এই পবিত্র স্থানে পদার্পণ করে আল্লাহর বান্দা-সকল মহান প্রভুর ঘর তাওয়াফ (চারদিক প্রদক্ষিণ) করেন এবং ধর্মীয় আবেগসহ মানুষের ভিড় ঠেলে কালো পাথরের দিকে অগ্রসর হতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেন, যাতে সেটাকে স্পর্শ ও চুম্বন করা যায়। অতঃপর বান্দা ‘সাঈ’ (সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে দ্রুত হাঁটাহাঁটি) করতে যান। যিলহাজ্জ্ব মাসের নবম দিনে প্রত্যেক হাজ্বী সাহেব/সাহেবা আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হন; সেখানে যোহর ও আসর ওয়াক্তের নামাযগুলো একত্রে পড়া হয়। মোযদালিফা নামের জায়গায় মাগরেব ও ‘এশা ওয়াক্তের নামাযগুলো ’এশা’র সময় একত্রে পড়া হয়। অতঃপর মিনা’তে ‘রামী’ তথা কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়, যা শেষ করে পশু কোরবানী দেয়া হয়।
এসব ধর্মীয় প্রথার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকলেও এগুলোর উদযাপন ধর্মীয় আবেগ ও ভক্তিরই প্রতিফলন করে। মানব মস্তিষ্ক হয়তো বারংবার এসব প্রথার যুক্তিসঙ্গত কারণ তালাশ করতে পারে, কিন্তু কোনো যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যাতেই সদুত্তর মেলে না। অপর পক্ষে, একই প্রশ্ন যদি কারো আবেগের সামনে স্থাপন করা হয়, তবে এর উত্তরে হজ্জ্বের এসব প্রথার পেছনে যুক্তি দেখানো হবে এই যে, এতে ভক্তি ও ভালোবাসারই এক গোপন ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।
সর্বশক্তিমান খোদাতা’লা তাঁর প্রিয় বান্দাদের এই ভক্তিমূলক আচরণকে এতোখানি কবূল করেছেন যে তিনি শেষ বিচার দিবস অবধি তাঁদের এই সাধনাকে অনুশীলনীয় এবাদত-বন্দেগী হিসেবে পালনের নির্দেশ জারি করেছেন। হজ্জ্বের আকারে এই (আধ্যাত্মিক) সাধনার পুনঃপুনঃ অনুশীলন প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহতা’লার ওই সমস্ত আশীর্বাদধন্য পুণ্যবান বান্দাদেরকে স্মরণ করারই একটি রীতি। তাই হজ্জ্ব হলো মূলতঃ (প্রিয় বান্দাদের) এক স্মৃতিচারণমূলক ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
আল্লাহর আশীর্বাদধন্য প্রিয় বান্দাদের (পুণ্যদায়ক) কর্ম, এবাদত-বন্দেগী ও কার্যকলাপের স্মৃতির প্রতি হজ্জ্বের রীতিনীতি বাস্তবে কীভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন হতে পারে তা এই অধ্যায়ে প্রকাশ করা হবে। অনুরূপভাবে, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও মা হাজেরা (রা:) তাঁদের আমল (পুণ্যদায়ক কর্ম) এমনভাবে পালন করেছিলেন যার দরুন আল্লাহতা’লা তা সম্মানিত করেন এভাবে যে, সর্বশেষ নবী (দ:)-এর উম্মতবৃন্দ তা হজ্জ্বের রীতি হিসেবে আমল করবেন। হজ্জ্বের এই প্রথা যেগুলো যিলহজ্জ্ব মাসের ৮ম হতে ১৩তম দিবসের মধ্যে পালন করা হয়, সেগুলো সম্পর্কে নিচে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া হলো:
১.৮ এহরাম: হজ্জ্বে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের পরিধেয় বস্ত্রের স্মরণে
হজ্জ্ব ও উমরাহ পালনের ক্ষেত্রে ‘এহরাম’ (বস্ত্র) বাঁধা হলো একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কা’বা ঘর যে ব্যক্তি তাওয়াফ করবেন, তাঁর জন্যে এটা পরিধান করা অত্যাবশ্যক। আল্লাহ পাকের আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ হজ্জ্বের সময় যে বস্ত্র পরতেন, এই দুইখানি কাপড় ওই একই পরিচ্ছদ। আল্লাহতা’লা (তাঁদের) এই বসন এতোই পছন্দ করেছেন যে তিনি হাজ্বী সাহেবদের জন্যে নিজেদের গতানুগতিক জামাকাপড় ছেড়ে ওই দুই ফালি কাপড় পরাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। এই একই দু টুকরো কাপড় গায়ে দিয়ে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে আগত হাজ্বী সাহেবান সত্তরজন পয়গম্বর (আ:)-এর নিজ নিজ নবুওয়্যতকালে এহরাম হিসেবে পরিধানকৃত বস্ত্রের ওই প্রথাটি-ই চর্চা করে থাকেন। নিচে বর্ণিত হাদীসগুলো এই বিষয়টিকে খোলাসা করেছে:
১. হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা:) মহানবী (দ:)-এর বাণী উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন, “সত্তরজন পয়গম্বর (আ:) আল-রাওহা (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী উপত্যকা)-এর পাথরগুলো পার হন; এঁদের মধ্যে ছিলেন পয়গম্বর মূসা (আ:) যিনি একটি বস্ত্রাবৃত অবস্থায় ও খালি পায়ে আল্লাহতা’লার প্রাচীন ঘরে পৌঁছেন।” [ইমাম আবূ ইয়া’লা কর্তৃক নিজ ‘আল-মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণিত, ১৩:২০১ ও ২৫৫ #৭২৩১ ও #৭২৭১; হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) হতেও ইমাম আবূ ইয়া’লা প্রণীত ’আল-মুসনাদ’ গ্রন্থে, ৭:২৬২ #৪২৭৫; ইমাম দায়লামী রচিত ‘আল-ফেরদৌস বি-মা’সূর আল-খিতা’ব, ৩:৪৩৩ #৫৩২৮; আবূ নুয়াইম লিখিত ‘হিলইয়া’ আল-আউলিয়া’ ওয়া তাবাক্বা’ত অাল-আসফিয়া’, ১:২৬০; ইমাম আল-মুনযিরী নিজের কৃত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিন আল-হাদীস আল-শারীফ’, ২:১১৮ #১৭৩৯ গ্রন্থে বলেন যে এই হাদীসের এসনাদ সম্পর্কে কোনো আপত্তি-ই উত্থাপিত হয়নি; ইমাম ইবনে আসাকির-ও এ হাদীসটি উদ্ধৃত করেন নিজ ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’ ২১:১৬৬ পুস্তকে; আর ইমাম আল-হায়সামী এটা বর্ণনা করেন আপন ‘মজমা’ আল-যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’আ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:২২০ কিতাবে]    
২. পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর ‘এহরাম’ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান, “আমি যেন দেখলাম (পয়গম্বর) মূসা বিন ‘এমরা’ন (আ:) এই উপত্যকায় দুটি ‘ক্বাতওয়া’নী’ (সাদা) বস্ত্র পরেছিলেন।” [ইমাম আবূ ইয়া’লা প্রণীত ‘আল-মুসনা’দ’, ৯:২৭ #৫০৯৩; আল-তাবারানী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ১০:১৪২ #১০,২৫৫; আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ৬:৩০৮ #৬৪৮৭; আবূ নু’য়াইম লিখিত ‘হিলইয়া আল-আউলিয়া ওয়া তাবাক্বা’ত আল-আসফিয়া’, ৪:১৮৯; আল-মুনযিরী তাঁর প্রণীত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিন আল-হাদীস আল-শরীফ’, ২:১১৮ #১৭৪০ গ্রন্থে বলেন যে আবূ ইয়া’লা ও আল-তাবারানী এই হাদীসটি ’হাসান’ সনদে বর্ণনা করেছেন; আল-হায়সামীও তাঁর কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’আ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:২২১ পুস্তকে বিবৃত করেন যে আবূ ইয়া’লা ও আল-তাবারানী ’হাসান’ সনদে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন]
৩. ইমাম আযরাক্বী (জন্ম: ২২৩ হিজরী) সর্বপ্রথম মক্কা মোয়াযযমার একখানি ইতিহাসগ্রন্থ সংকলন করেন, যা ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি নিজস্ব এসনাদ-সহ বর্ণনা করেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “সত্তরজন পয়গম্বর (আ:) হাজ্বী হয়ে আল-রাওহা’র গিরিপথ পেরিয়েছিলেন; তাঁরা পরেছিলেন ‘সূফ’ (পশমী বস্ত্র)।” [ইমাম আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৭১-৭২]
৪. হজ্জ্বের অনুষ্ঠানে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর পরিচ্ছদ সম্পর্কে সর্ব-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:)-এর শিষ্য ইমাম মুজাহিদ ইবনে জুবাইর (রহ:) বলেন: “পয়গম্বর মূসা (আ:) একটি লাল উটের ওপর চড়ে হজ্জ্ব পালন করেন। তিনি আল-রাওহা (এলাকা) অতিক্রম করেন দুটি ’ক্বাতাওয়া’নী’ (সাদা) বস্ত্র গায়ে; এর একটি শরীরের নিম্নভাগ আচ্ছাদনকারী বস্ত্র ছিল, আর অপরটি তাঁর দেহ মোবারককে আবৃত করেছিল। তিনি (এ সময়) কা’বা শরীফকে তওয়াফ (অর্থাৎ, চারদিক প্রদক্ষিণ) করেন।” [প্রাগুক্ত ইমাম আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৬৭]
৫. আরেকটি রওয়ায়াত তথা বর্ণনায় সর্ব-পয়গম্বর হূদ (আ:) ও সা’লেহ (আ:)-এর এহরা’ম সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে কোনো এক হজ্জ্ব (মওসূমে) মহানবী (দ:) ‘আসফান উপত্যকা অতিক্রম করার সময় জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে আবূ বকর, এটা কোন্ উপত্যকা?’ হযরত আবূ বকর (রা:) উত্তর দেন, ‘এটা ’আসফা’ন উপত্যকা।’ এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “হূদ (আ:) ও সালেহ (আ:) এই উপত্যকা অতিক্রম করেছিলেন কম বয়সী লাল উটের পিঠে চড়ে, যেগুলোর গলার দড়ি ছিল তাল গাছের আঁশ দিয়ে তৈরি। তাঁদের (পয়গম্বরবৃন্দের) কোমরের (নিচের) কাপড় ছিল একটি আলখাল্লা, আর বহিরাবরণের বস্ত্র ছিল একখানি কালো ও সাদা ডোরাকাটা ঢিলে জামা। আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ পবিত্র কা’বা গৃহে হজ্জ্ব পালনকালে তালবিয়া (অর্থাৎ, আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার বাক্যটি) পাঠ করছিলেন। [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৩২; আল-বায়হাক্বী নিজ ‘শুয়া’ব আল-ঈমান’, ৩:৪৪০ #৪০০৩ গ্রন্থে পয়গম্বর মূসা (আ:) সম্পর্কেও অনুরূপ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেন; এবং আল-মুনযিরী প্রণীত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিন আল-হাদীস আল-শরীফ’, ২:১১৭ #১৭৩৭]
এসব হাদীস থেকে পরিদৃষ্ট হয় যে হজ্জ্ব পালনকালে পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলী সাধারণ বস্ত্র পরিধান করতেন, আর তাঁরা তা পালন করতেন শুধুমাত্র মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের খাতিরেই। তাঁদের জামা ছিল দু টুকরো কাপড়ের সমষ্টি। এগুলোর একটি তাঁদের পবিত্র শরীরের নিম্নভাগকে আবৃত করতো, অপরটি তাঁদের দেহ মোবারককে আবৃত করতো।
আল্লাহতা’লার কাছে এই (দুই টুকরো) বস্ত্রটি এতোই পছন্দনীয় হয়েছিল যে তিনি (এ উম্মতের) হাজ্বীদের পরিধেয় বস্ত্র হিসেবে এটাকে বাধ্যতামূলক করে দেন। ফলে হজ্জ্ব পালনকালে কারো প্রথা বা রীতিগত বস্ত্র পরিধান একেবারেই নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মাথার চুল কামানো অবস্থায় নামায আদায় করাটা ভ্রান্তি ও সুন্নাহ’র পরিপন্থী হিসেবে পরিগণিত হয়, কিন্তু হজ্জ্বের বেলায় তা হয় না। ‘এহরা’ম’ অবস্থায় প্রত্যেক হাজ্বী সাহেব-ই আল্লাহর পবিত্র ঘর কা’বা শরীফের সামনে খালি মাথায় উপস্থিত হন। এরকম খালি মাথায় থাকাটা বিনীত ও সমর্পিত হওয়ার চিহ্ন বহন করে, আর আল্লাহতা’লার কাছেও এটা সবচেয়ে প্রশংসিত।
এর পাশাপাশি নখ ও চুল কাটা এবং মোচ ছাঁটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে [আল-কা’সানী কৃত ‘বাদা’ঈ আল-সানা’ঈ ফী তারতীব আল-শারা’ঈ, ২:১৯৮], যাতে বাহ্যিকভাবে সকল ক্ষেত্রেই মহান আল্লাহতা’লার পবিত্র পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের প্রবর্তিত রীতিনীতি অনুযায়ী হজ্জ্ব পালন করা যায়।
১.৯ তালবিয়া: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) কর্তৃক হজ্জ্বের প্রতি আহ্বান ও তার উত্তরের স্মরণে
হ্জ্জ্ব হোক বা উমরাহ, প্রত্যেক হাজ্বী সাহেব ‘এহরা’ম’ বেঁধে একান্ত নিষ্ঠা ও বিনয় সহকারে আল্লাহতা’লার কাছে নিম্নের বাক্যটি উচ্চারণ করে প্রার্থনা করেন: ”আমি হাজির, হে প্রভু, আমি হাজির! আপনার কোনো অংশীদার নেই। নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা, আশীর্বাদ ও সার্বভৌমত্ব আপনারই মালিকানাধীন। আপনার কোনো অংশীদার নেই।” [আল-বুখারী কর্তৃক নিজ সহীহ গ্রন্থে বর্ণিত: কিতাবুল হজ্জ্ব (হজ্জ্বের বই), ‘তালবিয্যা’ অধ্যায়, ২:৫৬১ #১৪৭৪; আল-বুখারী কৃত সহীহ গ্রন্থ:কিতাবুল লিবাস্ (পরিচ্ছদবিষয়ক বই), ‘চুল কলপ/মেহেন্দি’ অধ্যায়, ৫:২২১৩ #৫৫৭১; সহীহ মুসলিম: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘তালবিয়্যা ও এর বিবরণ’ অধ্যায়, ২:৮৪১-৮৪২ #১১৮৪; আল-তিরমিযী প্রণীত ‘আল-জামিউস্ সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব’, ’তালবিয়্যা-সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ’ অধ্যায়, ৩:১৮৭-১৮৮ #৮২৫-৮২৬; আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানাসিক (হজ্জ্বের রীতিনীতি), ‘তালবিয়্যা পালনের পদ্ধতি’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৬২ #১৮১২; আল-নাসাঈ লিখিত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক আল-হজ্জ্ব, ’তালবিয়্যা পালনের পদ্ধতি’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:১৫৯-১৬০ #২৭৪৭-২৭৫০; এবং ইবনে মাজাহ কৃত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক, ’তালবিয়্যা’ অধ্যায়, ২:৯৭৪ #২৯১৮]
হজ্জ্ব ও উমরাহ’র সময় এই তালবিয়্যা পবিত্র (কা’বা) মসজিদে পাঠ করা হলেও খুব কম সংখ্যক মানুষ-ই এর উৎপত্তি সম্পর্কে জানেন। এটা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আদেশ পালনার্থে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর কা’বা ঘর নির্মাণ সুসম্পন্ন করার পর তাঁর আহ্বানের প্রতি প্রায় চার হাজার বছর যাবত সাড়া প্রদানেরই একটি রীতি। এ প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বিবৃত হয়েছে:
“এবং (হে ইবরাহীম) মানুষের মধ্যে হজ্জ্বের সাধারণ ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার কাছে উপস্থিত হবে পদব্রজে ও প্রত্যেক ক্ষীণকায় উটনীর পিঠে করে, যা দূর-দূরান্তের পথ থেকে আসে।” [আল-ক্বুরআন, ২২:২৭; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন সাহেব কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’ বাংলা সংস্করণ]
রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস তথা বাণীসমূহে বিবৃত হয় যে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) আবূ ক্বুবায়স্ পর্বতশিখরে আরোহণ করেন এবং গোটা মনুষ্যকুলের প্রতি এই মর্মে আহ্বান জানান যে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে খোদার ঘরে তাদের হাজির হওয়া উচিত। [ইবনে আবী হা’তিম কর্তৃক নিজ ‘তাফসীর আল-কুরআন আল-’আযীম’ ৮:২৪৮৭-২৪৮৮ গ্রন্থে বর্ণিত; ইবনে জাওযী কৃত ‘যা’দ আল-মাসীর ফী ‘ইলম আল-তাফসীর’, ৫:৪২৩; ইমাম সুয়ূতী প্রণীত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ৬:৩২; এবং ইবনে ‘আজীবা রচিত ‘আল-বাহর আল-মাদীদ ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-মাজীদ’, ৪:৪১০]
স্থান-কালের উর্ধ্বে উঠে এই আহ্বানকে (পৃথিবীতে) মনুষ্য বসতির সর্বত্র পৌঁছে দেয়া হয়। বস্তুতঃ জন্মগ্রহণ করেননি আধ্যাত্মিক জগতের এমন সমস্ত আত্মা-ও এই আহ্বান শুনতে ও দেখতে পান; যিনি-ই এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বলেন ‘আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ (অর্থাৎ, আমি হাজির), তাঁকেই হজ্জ্ব করার সামর্থ্য মঞ্জুর করা হয় এবং মহান আল্লাহতা’লার ঘরে হাজির হওয়ার অনুমতিও দেয়া হয়, যা নিম্নবর্ণিত হাদীসগুলোতে প্রমাণিত হয়:
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন হুযূরে পাক (দ:)-এর হাদীস, যিনি বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যখন কা’বা ঘর নির্মাণ করেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর প্রতি এ মর্মে ঐশী প্রত্যাদেশ দেন যেন তিনি মানবজাতিকে হজ্জ্বের দিকে আহ্বান জানান। পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের প্রভু (তাঁর) একখানি ঘর নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যেন তোমরা তাতে হজ্জ্ব সম্পন্ন করো।’ এমন কোনো পাথর, গাছ, পাহাড় বা মাটি ছিল না যেটা এই আহ্বান শুনে না বলেছিল, ’আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির!’ [আল-হাকীম কর্তৃক নিজ ‘আল-মোস্তাদরাক ‘আলা আল-সহীহাইন’, ২:৬০১ #৪০২৬ গ্রন্থে বর্ণিত; আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৭৬ #৯৬১৩; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘’শু’আব আল-ঈমান, ৩:৪৩৯ #৩৯৯৮; আল-তাবারী রচিত ‘তা’রিখ আল-উমাম ওয়া আল-মুলূক’, ১:১৫৬; মুজাহিদ লিখিত ‘আল-তাফসীর’, ২:৪২২; আল-জাসসা’স কৃত ‘আহকা’ম আল-ক্বুরআন, ৫:৬৩; আল-তাবারী প্রণীত ‘জামে’ আল-বায়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ১৭:১৪৪; এবং ইমাম সুয়ূতী রচিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর, ৬:৩২]
২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যখন কা’বা ঘরের নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন, তখন তাঁকে বলা হয়, ‘মানুষকে হজ্জ্বের দিকে আহ্বান করুন।’ তিনি আরয করেন, ‘হে আমার প্রভু, আমার কণ্ঠস্বর (অতোদূর) পৌঁছুবে না।’ সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা বলেন, ‘উচ্চস্বরে আহ্বান করুন, আমি সমগ্র সৃষ্টিকে তা শোনাবো।’ অতঃপর পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) বলেন, ‘ওহে মানবকুল! মহান আল্লাহ পাক তোমাদের জন্যে হজ্জ্বের বিধান জারি করেছেন।’ বর্ণনাকারী (সাহাবী) আরো যোগ করেন, ‘এই ঘোষণা আসমান ও জমিনে অবস্থিত সকল সৃষ্টি-ই শুনতে পান। তোমরা কি দেখতে পাও না পৃথিবীর দূর-দূরান্ত হতে মানুষ (এ আহ্বানে সাড়া দিতে) কীভাবে তালবিয়্যা পাঠ করতে করতে এসে হাজির হন?’ [ইবনে আবী শায়বা কর্তৃক নিজ ‘আল-মোসান্নাফ’, ৬:৩২৯ #৩১৮১৮ গ্রন্থে বর্ণিত; আল-হা’কিম কৃত ‘আল-মোস্তাদরাক ‘আলা আল-সহীহাইন, ২:৪২১ #৩৪৬৪; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৭৬ #৯৬১৪; আল-মাক্বদাসী রচিত ‘আল-আহা’দীস আল-মুখতা’রা, ১০:২০-২১; আল-তাবারী তাঁর ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ১৭:১৪৪ গ্রন্থে সাঈদ বিন জুবায়র হতেও এই বর্ণনাটি লিপিবদ্ধ করেন; আল-সুযূতী লিখিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ৬:৩২; ইমাম সুযূতী একই গ্রন্থের (দুররুল মানসূর) ৬:২৩৩-এ এই রওয়ায়াত সাঈদ বিন জুবায়র হতেও বর্ণনা করেন; আল-শওকানী কৃত ‘ফাতহুল ক্বাদীর’, ৩:৪৫০; এবং আ’লূসী প্রণীত ‘রূহু আল-মা’আ’নী ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম ওয়া আল-সাব’ আল-মাসা’নী’, ১৭:১৪৩]  
৩. “এবং (হে ইবরাহীম) মানুষের মধ্যে হজ্জ্বের সাধারণ ঘোষণা করে দাও” – ক্বুরআন মজীদের এই আয়াতটি প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম খলীলউল্লাহ (আ:) একটি পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘ওহে মানবকুল! হজ্জ্ব তোমাদের প্রতি ফরয করা হয়েছে।’ সকল পুরুষের ঔরসে ও নারীর গর্ভে যারা ছিলেন, তাঁদের সবাইকেই এই আহ্বান শোনানো হয়; আর অনাদিকাল হতে আল্লাহর জ্ঞাত সব মো’মেন বান্দা যাঁদের ভাগ্যে শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত হজ্জ্ব নসীব করা হয়েছিল, তাঁরা এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে বলেন, ‘আমি হাজির, হে প্রভু, আমি হাজির।’ [আল-তাবারী কর্তৃক নিজ ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ১৭:১৪৪; আল-সুয়ূতী কৃত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর, ৬:৩৩; আল-তাবারী প্রণীত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়া আল-মুলূক’, ১:১৫৭; এবং আল-’আসক্বালা’নী রচিত ‘ফাতহ্ আল-বা’রী’, ৬:৪০৬]
৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাণী; তিনি বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যখন কা’বা ঘরের নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন, তখন আল্লাহতা’লা তাঁকে হজ্জ্বের আহ্বান জানাতে নির্দেশ দেন। এমতাবস্থায় তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে উচ্চস্বরে বলেন, ‘ওহে মানবকুল! তোমাদের প্রভু তোমাদেরই জন্যে একটি ঘর নির্ধারণ করেছেন; অতএব, তোমরা হজ্জ্ব পালন করো এবং আল্লাহর (আহ্বানের) প্রতি সাড়া দাও।’ সকল পুরুষের ঔরসে এবং নারীর গর্ভে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা উত্তর দেন, ‘আমরা উত্তর দিচ্ছি! আমরা উত্তর দিচ্ছি! আমি হাজির, হে প্রভু, আমি হাজির!’ হাদীসটির বর্ণনাকারী (সাহাবী) আরো যোগ করেন, যে কেউ আজকাল হজ্জ্ব পালন করলে তিনি সে সকল (নেককার) বান্দার অন্তর্গত, যিনি পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর আহ্বানে যতোবার তালবিয়্যা পাঠের ভিত্তিতে সাড়া দিয়েছিলেন। [আল-ফা’কাহী প্রণীত ‘আখবা’র মক্কা ফী ক্বাদীম আল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ১:৪৪৬ #৯৭৩; এ হাদীস সংক্ষেপে মুজা’হিদ বিন জুবায়র হতে নিম্নোক্ত বইগুলোতে উদ্ধৃত হয়েছে: ইবনে আবী শায়বা রচিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৬:৩৩০ #৩১,৮২৬; আল-তাবারী লিখিত ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ১৭:১৪৫; ইবনে আবদ আল-বার্র প্রণীত ‘আল-তামহীদ লিমা’ ফী আল-মুওয়াত্তা মিন আল-মা’আনী ওয়া আল-আসা’নীদ’, ১৫:১৩১; এবং আল-যায়লাঈ কৃত ‘নাসব আল-রা’এয়া লি আহা’দীস আল-হেদা’এয়া’, ৩:২৩]
’লাব্বায়েক’-এর এক মুহূর্তের এ আহ্বান সহস্র সহস্র বছর আগে জানানো হলেও এই ঐশী সুরের অনুরণন চারদিক থেকেই শোনা যাচ্ছে। হাজ্বী সাহেবান এটা আবৃত্তি করার মাধ্যমে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত এ ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে অতীতের ঘটনার স্মৃতিচারণ করা দ্বীন ইসলামের শিক্ষার সাথে একদম সঙ্গতিপূর্ণ। অনুরূপভাবে, মওলিদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর উদযাপনের মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের স্মৃতিচারণ করি এবং তাঁর এ আবির্ভাবের প্রতি খুশি প্রকাশ করি। হুযূরে পূর নূর (দ:)-কে সমাবেশে, তাঁর প্রশংসায় নাত/শে’র/কসীদা/পদ্য আবৃত্তির মাধ্যমে এবং অন্যান্য প্রশংসনীয় আমল দ্বারা স্মরণ করা হয়।
১.১০ তওয়াফ: আম্বিয়া (আ:)-এর সুন্নাহ (রীতিনীতি)-এর স্মরণে
কা’বা গৃহের চারপাশ সাতবার ঘুরে ঘুরে প্রদক্ষিণ করা তওয়াফ হিসেবে পরিচিত। এই তওয়াফ পালন করা পয়গম্বর আলাইহিমুস্ সালামেরই অনুশীলিত একটি রীতি (সুন্নাহ)। নিম্নবর্ণিত রওয়ায়াতগুলোতে এতদসংক্রান্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে:
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, কা’বা ঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, এতে প্রার্থনা ও তওয়াফ যিনি সর্বপ্রথম করেন, তিনি হলেন পয়গম্বর আদম (আলাইহিস্ সালাম)। [আল-আযরাক্বী প্রণীত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র’, ১:৩৬, ৪০; এবং ইমাম সুয়ূতী রচিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ১:৩১৩]  
২. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব বিবৃত করেন যে তাঁকে এ মর্মে জানানো হয়েছে, পয়গম্বর আদম (আ:) ধরণীতলে প্রার্থনা করার মতো কোনো বেহেশতী পরিবেশ না পেয়ে দুঃখভারাক্রান্ত ছিলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহতা’লা (ফেরেশতাকুলের মাধ্যমে) পয়গম্বর আদম (আ:)-এর জন্যে একটি পবিত্র মসজিদ বানিয়ে দেন এবং সেই স্থানে বসতি করতে তাঁকে আদেশ করেন। হযরত আদম (আ:) মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন এবং তিনি যেখানে বিশ্রাম নেন, সেখানে আল্লাহতা’লা পানির ঝর্ণা সৃষ্টি করে দেন। অতঃপর তিনি মক্কা শরীফ পৌঁছুলে সেখানে তিনি বসতি স্থাপন করে ওই কা’বা গৃহের পাশে আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হন এবং কা’বা গৃহ তওয়াফ করেন। তাঁর বেসাল (পরলোকে আল্লাহর সাথে মিলনপ্রাপ্তি) না হওয়া পর্যন্ত এই স্থান-ই হয় তাঁর আবাসস্থল। [আল-আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৩৯; ইবনে আসাকির লিখিত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৭:৪২৫; এবং আল-মাক্বদাসী প্রণীত ‘আল-বাদ’ ওয়া আল-তা’রীখ’, ৪:৮২]
৩. খলীফা উমর আল-খাত্তাব (রা:) হযরত কা’আব আল-আহবার (রা:)-কে আল্লাহতা’লার ঘরটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি উত্তরে বলেন, “আল্লাহতা’লা পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সাথে একটি হীরের মোড়কের ভেতরে কা’বা ঘরটি দুনিয়াতে নামিয়ে দেন এবং তাঁকে বলেন, ‘ওহে আদম! আমি আমার গৃহ তোমার সাথে পৃথিবীতে পাঠালাম। এটাকে তওয়াফ করতে হবে এবং এর পাশে এবাদত-বন্দেগীও করতে হবে, ঠিক যেমনটি করা হয় আমার ’আরশে।’ ফেরেশতাকুল ওই ঘরের সাথে অবতীর্ণ হন এবং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও এর নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন। হযরত আদম (আ:) এই কা’বা ঘরের তওয়াফ করতেন, যেমনভাবে ’আরশকে ঘিরে তা করা হয়। আর তিনি এর পাশে নামায-দোয়াও আদায় করতেন, যেমনটি তিনি ’আরশের পাশে প্রার্থনা করতেন।” [আল-আযরাক্বী রচিত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৩৯]
৪. পয়গম্বর আদম (আলাইহিস্ সালাম) ছাড়াও অসংখ্য আম্বিয়া (আলাইহিমুস্ সালাম) কা’বা ঘরের তওয়াফ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত মুজা’হিদ (রহ:) বলেন, “পঁচাত্তর জন পয়গম্বর (আ:) হজ্জ্ব পালন করেন। এঁরা সবাই কা’বা ঘরকে তওয়াফ করেন।” [আল-আযরাক্বী কৃত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৬৭-৬৮; আল-ফা’কাহী প্রণীত ‘আখবার মক্কা ফী ক্বাদীম অাল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ৪:২৬৮ #২৫৯৯; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-’ইলাল ওয়া মা’রিফা আল-রিজা’ল’, ৩:১৯৩ #৪৮৩১]
কা’বা শরীফকে সাতবার তওয়াফ করাও পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীরই রীতি (সুন্নাহ)।
৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন: “পয়গম্বর আদম (আ:) হজ্জ্ব পালন করেন এবং কা’বা ঘরকে সাতবার প্রদক্ষিণ (তওয়াফ) করেন।” [আল-আযরাক্বী কৃত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৪৫; এবং আল-সুয়ূতী লিখিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ১:৩২০]
৬. ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আবী সুলাইমান বলেন: পয়গম্বর আদম (আ:) দুনিয়াতে অবতরণের পরে কা’বা ঘরকে সাতবার তওয়াফ করেন। [আল-আযরাক্বী প্রণীত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৪৩]
৭. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব সর্ব-পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:)-এর তওয়াফ প্রসঙ্গে লেখেন: পয়গম্বর ইবরাহীম খলীলউল্লাহ (আলাইহিস্ সালাম) পবিত্র কা’বা ঘর নির্মাণ সুসম্পন্ন করার পর হযরত জিবরীল (আ:) তাঁর কাছে আসেন এবং তাঁকে বলেন, ‘এটাকে সাতবার তাওয়াফ করুন।’ এমতাবস্থায় সর্ব-পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:) কা’বা ঘরকে সাতবার তওয়াফ করেন। [আল-আযরাক্বী লিখিত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৬৫; এবং আল-কুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআন, ২:১২৯]
সর্বশেষ পয়গম্বর হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামের এই আচরিত প্রথাটিকে কা’বা শরীফের সাতবার তাওয়াফ দ্বারা সংরক্ষণ করেন।
৮. হযরত উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রা:) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (দ:) মক্কা মোয়াযযমায় প্রবেশ করে কা’বা গৃহকে সাতবার তাওয়াফ করেন। [আল-বুখারী লিখিত ‘সহীহ’: কিতাবুল হাজ্জ্ব, ‘যে ব্যক্তি মাক্বাম-এ-ইবরাহীমের পেছনে তাওয়াফ-পরবর্তী দুই রাক’আত নামায আদায় করেন’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮৮ #১৫৪৭; আল-বুখারী কৃত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী সাঈ সম্পর্কে বর্ণিত বিষয়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৯৩ #১৫৬৩; আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘উমরা-শেষে এহরাম খোলার সময়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৬৩৬ #১৭০০; এবং মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘হজ্জ্বে এহরাম বাঁধা ব্যক্তির প্রতি আরোপিত বাধ্যবাধকতা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯০৬ #১২৩৪]  
৯. হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:) বর্ণনা করেন: মহানবী (দ:) মক্কা শরীফে প্রবেশ করলে তিনি কা’বা ঘর সাতবার তওয়াফ করেন। [আল-তিরমিযী রচিত ‘আল-জা’মে’ আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘আল-মারওয়ার আগে আল-সাফা’য় আরম্ভ করা প্রসঙ্গে বর্ণনাসমূহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২১৬ #৮৬২; আল-তিরমিযী কৃত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ’: আবওয়াব আল-তাফা’সীর, ‘সূরা আল-বাক্বারা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫: ২১০ #২৯৬৭; আল-নাসাঈ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতাব মানা’সিক আল-হাজ্জ্ব, ‘তাওয়াফ-পরবর্তী দুই রাক’আত নামাযশেষে বক্তব্য’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২৩৫ #২৯৬১; ইবনে খুযায়মা লিখিত ’আল-সহীহ’, ৪:১৭০ #২৬২০; এবং আল-তাবারানী রচিত ‘’আল-মু’জাম আল-সগীর’, ১:১২৬ #১৮৭]
এসব রওয়ায়াত হতে সহজে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে তাওয়াফ (সাতবার প্রদক্ষিণসহ) পালন করাটা পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দেরই পদাঙ্ক অনুসরণ; এর পালনের মাধ্যমে আমরা পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের পুনঃপুনঃ স্মৃতিচারণ করে থাকি।
১.১১ রামল: মহানবী (দ:) ও সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর দ্বারা অনুশীলিত তওয়াফ-পদ্ধতির স্মরণে
তাওয়াফ পালন হজ্জ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের একটি। পুরুষ হাজ্বীদের আদেশ করা হয়েছে যেন তাঁরা তাওয়াফ তথা প্রদক্ষিণের প্রথম তিনবার কিছুটা গর্বের সাথেই তা সম্পন্ন করেন। এর ইসলামী পারিভাষিক শব্দ হচ্ছে ‘রামল’। তবে সার্বিকভাবে বলা যায়, গর্বভরে হাঁটা ঔদ্ধত্যেরই একটি চিহ্ন এবং এটা আল্লাহতা’লা পছন্দ করেন না; তবে হজ্জ্বের সময় এর বিপরীত-ই ঘটে থাকে। [নোট: হা’রিসা বিনতে ওয়াহহাব অাল-খুযাঈ (রা:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান, “আমি কি তোমাদেরকে বেহেশতী মানুষদের সম্পর্কে জানাবো না? তারা হলো যারা দুর্বল এবং দুর্বল বলে মনে করা হয়। কিন্তু যদি তারা আল্লাহর নামে কসম/শপথ করে, আল্লাহতা’লা তা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করে দেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামী লোকদের সম্পর্কে বলবো না? তারা হলো যারা অমার্জিত, উদ্ধত ও অহঙ্কারী।” এ হাদীস বর্ণনা করেন অাল-বুখারী তাঁর ‘সহীহ’: কিতা’ব আল-তাফসীর, সূরা নূন ওয়াল্ ক্বালাম’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৮৭০ #৪৬৩৪ গ্রন্থে; আল্-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ’: কিতা‘ব আল-আদাব, ’ঔদ্ধত্য’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২২৫৫ #৫৭২৩; এবং মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতা’ব আল-জান্নাহ ওয়া সিফা নাঈমিহা’ ওয়া আহলিহা’, ‘দাম্ভিক জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং দুর্বল জান্নাতে প্রবেশ করবে’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২১৯০ #২৮৫৩। হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান, “আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন: শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে আমারই ভূষণ এবং অহঙ্কার আমারই পরিধেয়। যে কেউ এগুলোর কোনোটি আমার কাছ থেকে অপসারণ করতে চাইবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।” এ হাদীস বর্ণনা করেন ইবনে আবী শায়বা নিজ ‘আল-মুসান্নাফ’, ৫:৩২৯ #২৬,৫৭৯ গ্রন্থে; আল-তাবারানী এটা হযরত আলী (ক:) হতে উদ্ধৃত করেন নিজ ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ৩:৩৫২ #৩৩৮০ পুস্তকে; আল-ক্বাদা’ঈ কৃত ‘মুসনাদ আল-শিহা’ব’, ২:৩৩১ #১৪৬৪; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘শু’আব আল-ঈমা’ন’, ৬:৩৮০ #৮১৫৭]
এতে নিহিত (ঐশী) জ্ঞান-প্রজ্ঞা এই যে, মদীনায় হিজরতের পরে মুসলমানবৃন্দ অবিরত অনেক সংগ্রামের ফলে দুর্বল ও ক্ষীণকায় হয়ে পড়েন। হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপিত হওয়ার এক বছর পর তাঁরা মক্কা মোয়াযযমায় উমরাহ হজ্জ্ব পালন করতে ফেরত গেলে তাঁদের শরীরে এই দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়। মক্কার কুফফার (অবিশ্বাসী গোষ্ঠী) দেখতে পায় যে মুসলমানবৃন্দ তাওয়াফ পালনে ধীরগতিসম্পন্ন; আর তাই তারা মুসলমানদেরকে এ মর্মে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে যে তাঁরা মক্কা ছেড়ে যাওয়ায় এতোই ক্ষীণকায় হয়েছেন, যার দরুন তাঁরা এমন কি ঠিকভাবে হাঁটতেও পারছেন না। এমতাবস্থায় মহানবী (দ:) সম্মানিত সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সাড়ম্বরে হাঁটতে নির্দেশ দেন, যাতে অবিশ্বাসীদের মস্তিষ্ক থেকে এই ধারণা দূর হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের পরে যদিও কোনো অমুসলিম আর সেখানে অবশিষ্ট ছিল না, তবুও তাওয়াফের এ রীতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই একই রকমভাবে পালিত হয়ে আসছে।
ইমাম মুসলিম তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থের ‘কিতাবুল হজ্জ্ব’ বইয়ের ‘এসতেহবা’ব আল-রামল ফী আল-তাওয়া’ফ ওয়া আল-উমরা ওয়া ফী আল-তাওয়া’ফ আল-আওয়াল মিন আল-হাজ্জ্ব’ (উমরা‘র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তাওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা) শীর্ষক অধ্যায়ে এ বিষয়ে অনেক রওয়ায়াতের উল্লেখ করেন, যা নিম্নে লিপিবদ্ধ হলো:
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে প্রিয়নবী (দ:) ও তাঁর মহান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) মদীনা মোনাওয়ারায় এক মহামারী দেখা দিলে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁরা (হুদায়বিয়ার সন্ধির এক বছর পর উমরা’র উদ্দেশ্যে) মক্কা মোয়াযযমায় উপস্থিত হওয়ার সময় (সেখানকার) মুশরিক নেতৃবর্গ তাদের অনুসারীদের বলে, ‘তোমাদের কাছে এমন এক জাতি আগমন করবে যারা রোগে দুর্বল হয়ে গিয়েছে।’ এতদশ্রবণে মক্কাবাসী মানুষ কালো পাথরের কাছে গিয়ে বসেন। অতঃপর মুসলমানবৃন্দ সেখানে পৌঁছুলে রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁদেরকে প্রথম তিন তওয়াফ সাড়ম্বরে পালন করতে নির্দেশ দেন এবং দুই কোণার (অর্থাৎ, ইয়েমেনী কোণা ও কালো পাথরের কোণা) মধ্যবর্তী স্থানে হাঁটতে বলেন, যাতে মুশরিকবর্গ তাঁদেরকে শক্ত-সামর্থ্য দেখতে পায়। (এ দৃশ্য দর্শনে) মুশরিকবর্গ বিস্ময়ভরে বলে, ‘তোমরা কি আমাদের এ কথা বিশ্বাস করতে বলো যে এই মানুষগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে গিয়েছে? সত্যি তারা ভীষণ বলবান এবং তোমরা যা দাবি করছো তা হতে (সম্পূর্ণ) মুক্ত!’ [ইমাম মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘উমরা‘র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তাওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯২৩ #১২৬৬; ইমাম বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘রামল যেভাবে সূচিত হয়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮১ #১৫২৫; ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯৪; এবং ইমাম বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৮২ #৯০৫৬]
২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) আরেকটি রওয়ায়াতে স্পষ্টভাবে বলেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) কা’বা ঘরের চারদিক দ্রুত হেঁটে প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ) করেন এবং আল-সাফা ও আল-মারওয়া’র মধ্যবর্তী স্থানে (জোরে) সাঈ করেন, যাতে তিনি তাঁর দৈহিক শক্তি মুশরিকদের দেখাতে সক্ষম হন। [আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হাজ্জ্ব, ‘সাফা ও মারওয়া’র মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ সম্পর্কে যা যা বর্ণিত’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৯৪ #১৫৬২; মুসলিম প্রণীত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘উমরা‘র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তাওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা’ অধ্যায়,২:৯২৩ #১২৬৬; আল-তিরমিযী রচিত ‘আল-জামেউস্ সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘সাফা ও মারওয়া’র মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ সম্পর্কে যা যা বর্ণিত’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২১৭ #৮৬৩; আল-নাসাঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪০৫ #৩৯৪১; আল-হুমায়দী কৃত ‘আল-মুসনাদ, ১:২৩২ #৪৯৭; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘অাল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৮২ #৯০৫৭-৫৮]
৩. আবূ তোফায়ল আমির বিন ওয়া’সিলা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) মক্কা মোয়াযযমায় প্রবেশ করলে অবিশ্বাসীরা বলে, ‘মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীবৃন্দ ক্ষীণকায় হওয়ার দরুন কা’বা ঘরের তাওয়াফ করতে অক্ষম’। মুশরিকবর্গ তাঁর প্রতি হিংসাবোধ করতে থাকে। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে তওয়াফের প্রথম তিনবার রামল এবং পরবর্তী চারবার হাঁটতে নির্দেশ দেন। [মুসলিম রচিত ‘সহীহ’: কিতাবুল হাজ্জ্ব, ‘উমরা’র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯২১-৯২২ #১২৬৪; ইবনে হিব্বান লিখিত ‘সহীহ’, ৯:১৫৪ #৩৮৪৫; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৮২ #৯০৫৭-৯০৫৮]
১.১২ ইদতিবা’: সর্বশেষ নবী (দ:)-এর সুন্নাহ
তাওয়াফ পালনকালে এহরাম-এর কাপড় ডান হাতের বগলের নিচে গোঁজা এবং এর উভয় প্রান্ত বাম কাঁধের ওপরে স্থাপন করাকেই ইদতিবা’ বলে। [ইবনে মানযূর রচিত ‘লিসা’ন আল-আরব’, ৮:২১৬]
আমরা ইতিপূর্বে ব্যাখ্যা করেছি যে, মহাসম্মানিত পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) (শারীরিক) শক্তি ও সম্ভ্রম-জাগানোর এক প্রদর্শনী দিতে নিজ মহান সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে রামল পালন করতে আদেশ করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি তাওয়াফ পালনকালে এদতেবা’ পালনেরও নির্দেশ দেন, যার নজির তিনি-ই সর্বপ্রথমে স্থাপন করেন (এবং সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে এতে নেতৃত্ব দেন)। হজ্জ্ব ও উমরা’র উদ্দেশ্যে যেসব হাজ্বী সাহেব/সাহেবা সফর করেন, তাঁদের জন্যে এই প্রিয় সুন্নাহ’কে আঁকড়ে ধরা বাধ্যতামূলক। হাজ্বীবৃন্দ তাঁদের প্রিয়নবী (দ:)-এর অনুশীলিত এই রীতির স্মারক উদযাপন করে থাকেন।
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) ও তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দ ‘জি’রা’না হতে উমরা পালন করতেন। তাঁরা কা’বা ঘরের চারদিকে রামল পালন করতেন এবং নিজেদের (এহরামের) কাপড় (ডান) হাতের বগলের নিচে গুঁজে অপর প্রান্ত বাম কাঁধের ওপরে ছেড়ে দিতেন। [আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক (হজ্বের রীতিনীতিসম্পর্কিত বই), ‘তাওয়াফ পালনকালে এদতেবা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৭৭ #১৮৮৪; আহমদ বিন হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ, ১:৩০৬; আল-তাবারা’নী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর, ১২:৬২ #১২,৪৭৮; বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৭৯ #৯০৩৮-৯০৩৯; এবং আল-মাক্বদাসী রচিত ‘আল-আহা’দীস আল-মুখতা’রা, ১০:২০৭-২০৮ #২১৩-২১৫]
২. এয়া’লা বিন উমাইয়া (রা:) বলেন, মহানবী (দ:) সবুজ (এহরামের) কাগড় পরা অবস্থায় এদতেবা’ সহকারে তাওয়াফ পালন করেন। [আবূ দাউদ প্রণীত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক, ‘তাওয়াফ পালনকালে এদতেবা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৭৭ #১৮৮৩; আল-তিরমিযী কৃত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘মহানবী (দ:)-এর এদতেবা’ সহকারে তাওয়াফ পালন সম্পর্কে যা যা বর্ণিত’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২১৪ #৮৫৯; ইবনে মা’জাহ রচিত ‘আল-সুনান: কিতাবুল মানা’সিক, ‘এদতেবা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৮৪ #২৯৫৪; আল-দা’রিমী লিখিত ‘আল-সুনান, ২:৬৫ #১৮৪৩; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৭৯ #৯০৩৫]
৩. আল-তিবী (রহ:) এদতেবা’র অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা ব্যাখ্যাকালে বলেন, এটা স্রেফ সাহসের নিদর্শনস্বরূপ করা হয়েছিল, ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল তাওয়াফের সময় রামল পালনের সময়। [আযীম আবা’দী রচিত ‘আওন আল-মা’বূদ আলা’ সুনানে আবী দা’ঊদ’, ৫:২৩৬; এবং মুবা’রাকপূরী লিখিত ‘তোহফা আল-আহওয়াযী ফী শারহে জামে’ তিরমিযী’, ৩:৫০৬]
মক্কা মোয়াযযমায় কুফফার-বর্গের অস্তিত্বের সময়কাল হতে চৌদ্দ’শ বছর পরে আমাদের এই যুগেও প্রিয়নবী (দ:) ও তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দের সুন্নাহ (রীতি)-এর অনুকরণে এদতেবা’ পালন করা আমাদের জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের অন্তর ও মস্তিষ্ক (আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলোয়) আলোকিত হয়, আর এতে আমরা ওই ধরনের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আজো অটল, অবিচল থাকার প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা পাই।
১.১৩ কালো পাথর চুম্বন: আল্লাহর প্রিয় বান্দার অনুশীলিত প্রথার স্মরণে
আল-হাজর আল-আসওয়াদ তথা কালো পাথরকে পবিত্র মনে করার কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো, এটা জিবরাঈল ফেরেশতা (আ:) বেহেশত থেকে নিয়ে এসেছিলেন [আল-আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র, ১:৬২, ৬৪ এবং ৩২৫; ইবনে আবী শায়বা প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৩:২৭৫ #১৪,১৪৬; ইবনে আল-জা’আদ লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১৪৮ পৃষ্ঠা #৯৪০; আল-ফা’কাহী রচিত ‘আখবার মক্কা ফী ক্বাদীম আল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ১:৯১ #২৫; এবং আল-হায়সামী কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:২৪২]। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার আদেশক্রমে পয়গম্বরবৃন্দ (আলাইহিমুস্ সালাম) এই কালো পাথরকে চুম্বন করতেন এবং এসতেসলা’ম তথা সম্ভাষণ জানাতেন। সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আপন পূর্বসূরী পয়গম্বর ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামের সুন্নাহ তথা রীতি অনুসরণ করে নিজ পবিত্র হাত মোবারক দ্বারা কালো পাথরটিকে তার নির্ধারিত স্থানে বসিয়ে দেন এবং নিজের পবিত্র ঠোঁট দ্বারা চুম্বন করেন। এরই ফলশ্রুতিতে এটা হজ্জ্বের একটি প্রথায় পরিণত হয়। আজকে ঈমানদারবৃন্দ এই পাথরকে চুম্বন করার একমাত্র কারণ হচ্ছে মহানবী (দ:) এটাকে চুমো দিয়েছিলেন।
এই বাস্তবতা (খলীফা) হযরত উমর ফারূক (রা:)-এর বক্তব্য দ্বারা পরিস্ফুট হয়, যিনি একবার তাওয়াফ পালনকালে হজরে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আমি ভালো করেই জানি তুমি স্রেফ একটি পাথর। তুমি কারো উপকার বা ক্ষতি করতে অক্ষম। (খোদ) রাসূলুল্লাহ (দ:) তোমাকে চুম্বন করেছেন, এমনটি যদি আমি না দেখতাম, তাহলে কখনোই আমি এরকম করতাম না।” [আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘কালো পাথর সম্পর্কে যা উল্লেখিত হয়েছে’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৭৯ #১৫২০; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ’হজ্জ্ব ও উমরা’য় পালিত রামল’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮২ #১৫২৮; আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, কালো পাথর চুম্বন’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮৩ #১৫৩২; মুসলিম লিখিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘তাওয়াফ পালনকালে কালো পাথর চুম্বনের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯২৫ #১২৭০; ইবনে মা’জাহ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক’, ‘কালো পাথরের প্রতি সম্ভাষণ’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৮১ #২৯৪৩; আল-নাসাঈ কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪০০ #৩৯১৮; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৪৬ #৩২৫]
অপর এক বর্ণনায় হযরত উমর ফারূক (রা:) বলেন, “তুমি নিতান্ত-ই একটি পাথর মাত্র। রাসূলুল্লাহ (দ:) তোমাকে চুম্বন করেছেন, এমনটি না দেখলে আমি কখনো এরকম করতাম না।।” [ইমাম মালেক কৃত ‘মোওয়াত্তা: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘সম্ভাষণের সময় হজরে আসওয়াদের কোণা চুম্বন’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৩৬৭ #৮১৮; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৫৩ #৩৮০]
এই কথা বলার পর হযরত উমর ফারূক (রা:) কালো পাথরকে চুম্বন করতে অগ্রসর হন। ঘটনাটি এ বাস্তবতাকে পরিস্ফুট করে যে মহান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) কালো পাথরকে চুমো খেতেন মহানবী (দ:)-এর পদাঙ্ক অনুসরণেরই উদ্দেশ্যে; এটা ছিল তাঁদের জন্যে (হুযূর পাককে) স্মরণ করার খাতিরেই একটি অনুশীলিত রীতি। আর শেষ বিচার দিবস অবধি এই সুন্নাহ তথা রীতি বাক্বি বা অবশিষ্ট (মানে টিকে) থাকবে।
১: ১৪ মাক্বামে ইবরাহীম: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মরণে
মাক্বাম (মর্যাদাপূর্ণ স্থান) বলতে (আরবী) ভাষাবিদ্যায় এমন এক স্থানকে বোঝানো হয়, যেখানে কারো পা স্থাপিত হয়েছে [আল-ফারা’হীদী কৃত ‘কিতা’ব আল-’আইন’, ৫:২৩২; ফায়রূয আবা’দী প্রণীত ‘আল-ক্বা’মূস আল-মুহীত’, ৪:১৭০; ইবনে মানযূর রচিত ‘লিসা’ন আল-’আরব’, ১২:৪৯৮; এবং আল-যাবীদী লিখিত ‘তা’জ আল-উরূস’ মিন জওয়া’হির আল-ক্বা’মূস’, ১৭:৫৯২]। মাক্বাম-এ-ইবরাহীম সম্পর্কে বিভিন্ন মত বিদ্যমান। উলামাবৃন্দ ও মুফাসসিরীন-মণ্ডলী [সর্ব-হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:), ক্বাতাদা (রা:) প্রমুখের মতামতের ভিত্তিতে] বিশ্বাস পোষণ করেন যে ‘মাক্বাম-এ-ইবরাহীম’ হচ্ছে এই স্থানে অবস্থিত পাথরটির নাম। এখানে দুই রাক’আত নামায আদায় করা হয়ে থাকে। এটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত। [আল-তাবারী প্রণীত ‘জামেউল বয়া’ন ফী তাফসীরিল ক্বুরআ’ন’, ১:৫৩৭; আল-ক্বুরতুবী রচিত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ২:১১২; আল-রা’যী কৃত ‘আল-তাফসীর আল-কবীর’, ৪:৪৫; আল-আলূসী লিখিত ‘রূহুল মা’আনী ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন ওয়া সাব’ আল-মাসা’নী’, ১:৩৭৯; এবং আল-আসক্বালা’নী প্রণীত ‘ফাতহুল বা’রী’, ১:৪৯৯]
ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) বর্ণিত একটি হাদীসে ওপরের বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এ মর্মে যে, কা’বা শরীফ নির্মাণের সময় পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) পাথরগুলো জড়ো করতে থাকেন, আর পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) দেয়ালগুলো দাঁড় করাতে থাকেন। দেয়ালগুলো যখন বেশ উঁচু হয়, তখন পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) এই পাথরটির (মাক্বামে ইবরাহীম) ওপর ওঠে দাঁড়ান যাতে শীর্ষদেশে পৌঁছে ইমারতটির নির্মাণ সুসম্পন্ন করা যায়। [আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, দ্রুত ফেরত যাওয়া: তাড়াতাড়ি হাঁটা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৫ #৩১৮৪; আবদুর রাযযাক্ব প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৫:১১০ #৯১০৭; আল-তাবারী কৃত ‘জামেউল বয়া’ন ফী তাফসীরিল ক্বুরআ’ন’, ১:৫৫০; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম’, ১:১৭৮; এবং আল-ক্বাযউইনী রচিত ‘আল-তাদউয়ীন ফী আখবা’র ক্বাযউয়ীন’, ১:১০৫]
অপর এক রওয়ায়াতে বিবৃত হয় যে, পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর আনা পাথরগুলো বহন করা যখনই পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর জন্যে কষ্টসাধ্য হতো, তৎক্ষণাৎ তিনি মাক্বামে ইবরাহীমের ওপর ওঠে দাঁড়াতেন এবং সেটা তাঁকে মাটি থেকে ওপরে তুলে ইমারতটির চারপাশ ঘুরিয়ে আনতো, যতোক্ষণ না কা’বা শরীফ নির্মাণ সুসম্পন্ন হয়। [আল-আযরাক্বী লিখিত ‘আখবা’র মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র’, ১:৫৮ ও ২:৩৩]
হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেন যে হযরত উমর ফারূক (রা:) রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনি যদি মাক্বাম-এ-ইবরাহীমকে সালা’ত বা নামাযের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতেন!” অতঃপর আয়াতে করীমা অবতীর্ণ হয়: “আর (বল্লাম,) ’ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’। [আল-ক্বুরআন, ২:১২৫]
সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার প্রিয়নবী (দ:) অবিলম্বে মাক্বামে ইবরাহীমে নামায আদায় করে এই ঐশী আজ্ঞা পালন করেন। [আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-তাফসীর’, “আল্লাহর বাণী – ‘ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’” শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬২৯ #৪২১৩; আল-তিরমিযী লিখিত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ: আবওয়া’ব আল-তাফসীর’, ‘সূরা আল-বাক্বারা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২০৬ #২৯৬০; ইবনে মা’জাহ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব এক্বা’মা আল-সালা’হ ওয়াল-সুন্না ফীহা’, ‘ক্বিবলা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৩২২ #১০০৮; আল-নাসা’ঈ কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৬:২৮৯ #১০,৯৯৮; ইবনে হিব্বা’ন লিখিত ‘আল-সহীহ’, ১৫:৩১৯ #৬৮৯৬; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৩৬ #২৫০]
হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:) বর্ণনা করেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে যখন কা’বা শরীফের সামনে উপস্থিত হই, তিনি তখন তাওয়াফ (তিনবার রামল ও চারবার স্বাভাবিক গতিতে) পালন করেন। এর অব্যবহিত পরেই তিনি মাক্বাম-এ-ইবরাহীমের দিকে অগ্রসর হন এবং “আর (বল্লাম,) ’ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’ – ক্বুরআ’ন মজীদের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেন। অতঃপর তিনি কা’বা ও মাক্বামে ইবরাহীমের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে দুই রাকআত নামায আদায় করেন। [মুসলিম রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হজ্জ্ব’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৮৮৭ #১২১৮]
পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যে পাথরটির ওপর দাঁড়িয়ে পবিত্র কা’বা ঘর নির্মাণ করেছিলেন, আল্লাহতা’লা তাকে এবাদতগাহ (উপাসনার স্থান) করার আদেশ দেন, যেহেতু এটা ছিল শীর্ষস্থানীয় সাহাবী (পুণ্যাত্মা) হযরত উমর ফারূক (রা:)-এর (প্রাণের) আকাঙ্ক্ষা। এই পাথরটি আশীর্বাদধন্য, কেননা এর পাশেই দাঁড়িয়ে মহানতম পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নামায পড়েন। শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত পৃথিবীতে যতো হাজ্বী সাহেবান কা’বা শরীফের তাওয়াফ করবেন, তাঁদের জন্যে মাক্বামে ইবরাহীমের পাশে দুই রাকআত নামায আদায় করা ওয়া’জিব (বাধ্যতামূলক) হবে; এতে ব্যর্থ হলে তাওয়াফ পালন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অবশ্য কোনো স্থান সংকুলান না হলে অন্যত্র নামায পড়ার অনুমতি আছে, যদিও ওই মাক্বামের কাছে নামায পড়াটা প্রশংসনীয় বলে সাব্যস্ত হয়েছে। [আল-সারখাসী লিখিত ‘কিতা’ব আল-মাবসূত’, ৪:১২; আল-কা’সা’নী রচিত ‘বাদা’ঈ আল-সানা’ঈ ফী তারতীব আল-শারা’ঈ’, ২:১৪৮; আল-সামারক্বান্দী কৃত ‘তোহফা আল-ফুক্বাহা’, ১:৪০২; এবং ইবনে নুজাইম প্রণীত ‘আল-বাহর আল–রা’ইক্ব শারহে কানয আল-দাক্বা’ইক্ব’, ২:৩৫৬]
যেহেতু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর পবিত্র পদচিহ্ন মাক্বামে ইবরাহীম পাথরটির ওপর অঙ্কিত রয়েছে, সেহেতু কা’বা ঘর নির্মাণে তাঁর কর্মপ্রয়াসের স্মরণে মুসলমান সমাজ চিরকাল এটাকে শ্রদ্ধা করবেন এবং এর পাশে নফল নামায-ও আদায় করবেন।
১:১৫ সাফা ও মারওয়া’র সাঈ: হযরত মা হাজেরের সুন্নাহর স্মরণে
আল্লাহতা’লার পছন্দকৃত বান্দাদের এমন কিছু কাজ বিদ্যমান, যেগুলো দৃশ্যতঃ এবাদত-বন্দেগীর মতো দেখায় না এবং এবাদতের নিয়্যতেও সেগুলো পালিত হয়নি, কিন্তু মহান আল্লাহ পাক সেগুলোকে মহামূল্যবান বিবেচনা করে সংরক্ষণ করেছেন এমনভাবে যে, তিনি সেগুলোকে একটি সামষ্টিক এবাদতের অংশ হিসেবেই ঘোষণা করেছেন।
এর একটি (উৎকৃষ্ট) উদাহরণ হলো মা হাজেরা (রা:)-এর ঘটনাটি, যেখানে তিনি তাঁর শিশুপুত্র পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর জন্যে পানির তালাশে মরিয়া হয়ে আল-সাফা’ ও আল-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে ছুটোছুটি করেছিলেন। আল্লাহতা’লা তাঁর এই কাজটিকে এতো-ই পছন্দ করেন যে তিনি এ মর্মে আদেশ জারি করেন যেন হাজ্বী সাহেবান হজ্জ্বের অঙ্গ হিসেবে ওই দুটো পাহাড়ের মাঝখানে একইভাবে দ্রুত চলাচল করেন। এর পরিভাষাগত শব্দ হচ্ছে সা’ঈ। হজ্জ্ব ও উমরা উভয় ক্ষেত্রেই সা’ঈ ওয়া’জিব তথা অবশ্যকর্তব্য।
মনে রাখতে হবে যে সাতবার সা’ঈ পালনকালে সুনির্দিষ্ট কোনো ক্বুরআ’ন মজীদের আয়াত তেলাওয়াত কিংবা কোনো যিকর পাঠ নির্ধারণ করা হয়নি। যার যেমন ইচ্ছে সে মোতাবেক ক্বুরআ’ন মজীদের যে কোনো আয়াত তেলাওয়াত করার অনুমতি আছে; আর মহানবী (দ:)-এর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণ-ও জায়েয। মুখস্থ কিছু জানা না থাকলেও আল্লাহতা’লার মহিমাপূর্ণ নামগুলো জপা কিংবা বিশ্বাসসংক্রান্ত কলেমা-বাক্য মুখে আওড়ানোই যথেষ্ট হবে। নতুবা স্রেফ নিশ্চুপ থেকেও সা’ঈ সুসম্পন্ন করা বৈধ।
ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) ও অসংখ্য হাদীসশাস্ত্র বিশারদ এবং তাফসীরবিদ আল-সাফা ও আল-মারওয়া’র তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাথে সম্পর্কিত বেশ কিছু আহাদীস ও রওয়ায়াত লিপিবদ্ধ করেছেন। এর একটি নমুনা নিম্নরূপ:
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) মা হাজেরা (রা:) ও (তাঁর শিশুপুত্র) পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-কে সিরিয়া হতে মক্কা মোয়াযযমায় নিয়ে যান। ওই সময় নগরীটি বসতিহীন ছিল এবং পানির উৎস-ও দৃশ্যমান ছিল না। পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে আল্লাহর ঘরের পাশে রেখে তাঁদের কাছে কিছু খেজুর ও পানির মওজূদ জমা দিয়ে বিদায় নিতে গেলে মা হাজেরা (রা:) বেদনার্তস্বরে বলেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন আপনি, ইবরাহীম?’ আপনি কি আমাদেরকে এই বিরাণ মরু-উপত্যকায় রেখে চলে যাচ্ছেন?’ তিনি এই প্রশ্নটি বারংবার করতে থাকেন। কিন্তু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) তাঁর দিকে পেছন ফিরে তাকাননি। এমতাবস্থায় মা হাজেরা (রা:) জিজ্ঞেস করেন, ‘মহান আল্লাহতা’লা আপনাকে আদেশ করার কারণেই কি আপনি আমাদেরকে এখানে ছেড়ে যাচ্ছেন?’ তিনি এর প্রতি হাঁ-সূচক উত্তর দেন। অতঃপর মা হাজেরা (রা:) বলেন, ‘এ-ই যদি অবস্থা হয়, তাহলে আল্লাহতা’লা আমাদেরকে পরিত্যাগ করবেন না।’
এরপর মা হাজেরা (রা:) ওই স্থানেই বসে থাকেন যতোক্ষণ না পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) তাঁর যাত্রায় দৃষ্টির বাইরে চলে যান। তিনি যখন ‘সানিয়্যা’ নামের একটি জায়গায় পৌঁছেন, তখন দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন:
“হে আমার রব্ব! আমি আমার কিছু বংশধরকে (মানে মা হাজেরা ও পুত্র পয়গম্বর ইসমাঈল এবং পুত্রের অনাগত বংশধরদের) এমন এক উপত্যকায় বসতি স্থাপন করালাম, যেখানে ক্ষেত হয় না এবং যে স্থানটি আপনারই সম্মানিত ঘরের সন্নিকটে; হে আমাদের রব্ব! (এটা) এই জন্যে যে তারা নামায ক্বায়েম রাখবে। অতঃপর আপনি কিছু মানুষের অন্তরকে তাদের দিকে অনুরাগী করে দিন এবং তাদেরকে কিছু ফলমূল খেতে দিন; হয়তো তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।” [আল-ক্বুরআ’ন, ১৪:৩৭; মুফতী আহমদ এয়ার খান (রহ:) প্রণীত নূরুল এরফান]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, মা হাজেরা (রা:) তাঁর শিশু পুত্রকে বুকের দুধ খাওয়াতে আরম্ভ করেন এবং পানির মওজূদ হতে পান করতে থাকেন যতোক্ষণ না পাত্রের জল ফুরিয়ে যায়। এরপর তিনি ও তাঁর শিশু তৃষ্ণার্ত হন। মা হাজেরা (রা:) লক্ষ্য করেন যে তাঁর শিশুপুত্র বেজায় তৃষ্ণার্ত হয়ে কাতরাচ্ছেন এবং এর দরুন মাটিতে পা দ্বারা আঘাত করছেন। তিনি শিশুর এই অবস্থা আর সহ্য করতে পারেননি। আল-সাফা ছিল সবচেয়ে কাছে অবস্থিত পাহাড়। তাই তিনি তাতে আরোহণ করে উপত্যকার ওপারে মানুষজনের খোঁজ করেন। কাউকে না পেয়ে তিনি এরপর উপত্যকা অতিক্রম করে আল-মারওয়া পাহাড়ে ওঠেন। এরকম তিনি সাতবার করেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে মহা্নবী (দ:) এরশাদ ফরমান: এই দুটো পাহড়ের মধ্যবর্তী স্থানে মানুষের সা’ঈ করার কারণ এটাই। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’,“আল্লাহর বাণী – ‘ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’” শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২২৮-১২২৯ #৩১৮৪; অাল-নাসা’ঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১০০ #৮৩৭৯; আবদুর রাযযাক্ব কৃত আল-মুসান্নাফ, ৫:১০৫-১০৬ #৯১০৭; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১০০ #৮৩৭৯; আল-নাসা’ঈ লিখিত ‘ফাযা’ইলে সাহা’বা’, ১:৮২ #২৭৩; আল-ক্বুরতুবী রচিত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ৯:৩৬৮-৩৬৯; এবং ইবনে কাসীর কৃত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম’, ১:১৭৭]
মহান আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় বান্দীর ধার্মিকতা এতোই সযত্নে লালন করেন যে তিনি একে তাঁর নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি এরশাদ ফরমান:
“নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত।” [আল-ক্বুরআ’ন, ২:১৫৮]
এই ঘটনা আনুমানিক চার হাজার বছর আগে ঘটেছিল। ওই উপত্যকা ও পাহাড়গুলো তাদের মৌলিক আকৃতিতে এখন আর বিরাজ করছে ন। আর খোদাতা’লার প্রিয় বান্দীর শঙ্কাও বর্তমানে অস্তিত্বশীল নেই। তথাপিও হাজ্বী সাহেবান আল্লাহতা’লার আদিষ্ট দুই পাহাড়ের মাঝে সা’ঈ পালন করে থাকেন। এসব কিছুই মা হাজেরা (রা:) কর্তৃক তাঁর পুত্র পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর প্রতি অনুভূত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং তাঁরই অস্বস্তিকর ও পেরেশানি অবস্থার স্মরণার্থে করা হয়।
১:১৫.১ যমযম কূপ: নামের উৎপত্তির কারণ
পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) তীব্র তেষ্টাবোধের কারণে মাটিতে পা দ্বারা আঘাত করলে সেখান থেকে পানির নহর প্রবাহিত হয়। মা হাজেরা (রা:) এতো জোরে পানির স্রোত বইতে শুরু করায় আশঙ্কা করেন যে হয়তো পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর এতে ক্ষতি হতে পারে। তাই তিনি উচ্চস্বরে বলেন, ‘যাম যাম’ (থামো, থামো)! এমতাবস্থায় জলপ্রবাহের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ কারণেই অদ্যাবধি এই পানির উৎসকে যমযম নামে অভিহিত করা হয়।
সহস্র সহস্র বছর যাবত প্রবাহিত যমযম কূপের পানি হাজ্বী সাহেবানদের জন্যে এক ঐশী দান বটে। এই পানি ওযূ অবস্থায় ক্বিবলা তথা কা’বার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পান করাটা প্রথাসিদ্ধ; পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর সাথে এর সম্পৃক্ততার দরুন-ই এই বিশেষ বিধান জারি করা হয় [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘যমযম সম্পর্কে বর্ণিত বিষয়াদি’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৯০ #১৫৫৬; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আশরিবা’, দাঁড়িয়ে পান করা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২১৩০ #৫২৯৪; মুসলিম প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আশরিবা’, দাঁড়িয়ে যমযমের পানি পান’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩: ১৬০১-১৬০২ #২০২৭; এবং আল-আইনী লিখিত ‘উমদাত আল-ক্বা’রী শারহে সহীহ আল-বুখারী’, ৯:২৭৭]। বস্তুতঃ যমযম হচ্ছে ধরণীর বুকে সেরা (পানীয়) জল, আর এতে অনেক রোগের আরোগ্য-ও রয়েছে নিহিত।
ওপরোক্ত বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে দ্বীন-ইসলাম কেবল অতীতের ঘটনাবলী স্মরণ-ই করে না, বরঞ্চ বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে সেগুলোর উদযাপনকে বাধ্যতামূলক-ও করে দেয়। মওলিদুন্নবী (দ:)-কে ওই একই আঙ্গিক বা দৃষ্টিকোণ্ থেকে দেখতে বা মূল্যায়ন করতে হবে। হযরতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হলেন বিশ্বজগতের জন্যে খোদাতা’লার করুণা, দয়া ও আশীর্বাদের সেরা উৎস। মওলিদুন্নবী (দ:)-তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, যা দ্বারা তাঁর প্রতি প্রত্যেকের ভালোবাসা ও আনুগত্য সুদৃঢ় হয়, তা-ই এ উদযাপনের ভিত্তিমূল।
১.১৬ আরাফাত, মুযদালিফা ও মিনা: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর স্মরণে
প্রতি যিলহজ্জ মাসের নবম দিবসে হাজ্বী সাহেবান আরাফা’ ময়দানে অবস্থান করেন। লক্ষণীয় যে, সুনির্দিষ্ট কোনো এবাদত-বন্দেগীর আদেশ এখানে দেয়া হয়নি। আরাফাতে স্রেফ উপস্থিত থাকাটাই হজ্জ্বের অবশ্য পালনীয় শর্ত পূরণের জন্যে যথেষ্ট। আরাফাত আমাদেরকে পয়গম্বর আদম (আ:) ও মা হাওয়া (রা:)-এর পুনর্মিলিত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেটা ৯ই যিলহাজ্ব তারিখে ঘটেছিল; ঠিক যেমনটি এক রওয়ায়াতে প্রমাণিত হয় –
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: পয়গম্বর আদম (আ:) ভারতে অবতরণ করেন, আর মা হাওয়া (রা:) জেদ্দায়। বাবা আদম (আ:) তাঁর স্ত্রীর খোঁজ করতে থাকেন যতোক্ষণ না তাঁরা অবশেষে একে অপরের দেখা পান। মা হাওয়া (রা:) তাঁর কাছে আসেন, যার দরুন তাঁকে ‘মুযদালিফা’ তথা ‘(বাবা আদমের) নিকটে গমনকারিনী’ নামে অভিহিত করা হয়। স্বামী ও স্ত্রী পরস্পর পরস্পরকে ‘আরাফাতে’ চিনতে পারেন, তাই এর নাম আরাফাত (অর্থাৎ, যেখানে একে অপরকে চিনতে পারেন)। তাঁরা জাম’-এ পুনর্মিলিত হন, সে মোতাবেক-ই এর নামকরণ হয়েছে (মানে পুনর্মিলনের স্থান)। [আল-তাবারী লিখিত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল-মুলূক’, ১:৭৯; ইবনে আল-আসীর কৃত ‘আল-কা’মিল ফী আল-তা’রীখ’, ১:৩৪; ইবনে সা’আদ প্রণীত ‘আল-তাবাক্বা’ত আল-কুবরা’, ১:৩৯; এবং ইবনে আসা’কির রচিত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৬৯:১০৯]
২. পয়গম্বর আদম (আ:) ভারত উপমহাদেশের ‘নাওয়ায’ নামের এক পাহাড়ে অবতরণ করেন, আর মা হাওয়া (রা:)-কে জেদ্দায় প্রেরণ করা হয়। ইবনে সা’আদ (১৬৮-২৩০ হিজরী), আল-তাবারী (২৬৪-৩১০ হিজরী) ও ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৭ হিজরী) এই অভিমত পোষণ করেন যে, বাবা আদম (আ:) তাঁর স্ত্রীর সাথে আবার মিলিত হন আরাফাত নামের স্থানে, যার দরুন এই নামকরণ হয়েছে। [আল-তাবারী প্রণীত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল-মুলূক’, ১:৭৯; ইবনে সা’আদ কৃত ‘আল-তাবাক্বা’ত আল-কুবরা’, ১:৩৫-৩৬; এবং আল-নববী রচিত ‘তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল-লুগা’ত’, ৩:২৩৭]
৩. আল-ক্বুরতুবী (২৮৪-৩৮০ হিজরী) নিজ ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’ গ্রন্থে লেখেন: পয়গম্বর আদম (আ:) ভারত উপমহাদেশে অবতরণ করেন, আর মা হাওয়া (রা:) জেদ্দায়। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের সাক্ষাৎ পান আরাফা দিবসে আরাফা’তেরই ময়দানে। অতএব, এই দিনটি আরাফা’ নামে পরিচিত হয়, আর স্থানটি খ্যাত হয় আরাফাত নামে। এটা আল-দাহহা’কের বক্তব্য। [আল-ক্বুরতুবী প্রণীত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ২:৪১৫]
৪. আল-মুযদালিফা নামকরণের ব্যাপারে ইবনে হাজর আল-আসক্বালা’নী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী), এয়া’কূত আল-হামাভী (জন্ম:৬২৬ হিজরী) এবং আল-শওকানী (১১৭৩-১২৫০ হিজরী) লেখেন: আল-মুযদালিফাকে ’জাম’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়, কেননা বাবা আদম (আ:) সেখানেই মা হাওয়া (রা:)-এর সাথে পুনরায় মিলিত হন এবং তাঁর সান্নিধ্য পান। [আল-আসক্বালা’নী রচিত ‘ফাতহুল বা’রী’, ৩:৫২৩; এয়া’কূত আল-হামাভী কৃত ‘মু’জাম আল-বুলদা’ন’, ৫:১২১; এবং আল-শওকা’নী লিখিত ‘নায়ল আল-আওতা’র শারহ মুনতাক্বা’ আল-আখবা’র’, ১:৪২৩]
৫. মিনা’ নামকরণ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: মিনা’ নামকরণ হয় যখন হযরত জিবরাঈল (আ:) পয়গম্বর আদম (আ:) হতে পৃথক হতে চান এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন তিনি (বাবা আদম) কোনো কিছু কামনা করেন কি না। হযরত আদম (আ:) উত্তর দেন, ‘বেহেশত’। একারণেই এই স্থানকে মিনা’ নামে ডাকা হয় – পয়গম্বর আদম (আ:)-এর আকাঙ্ক্ষার দরুন। [আল-আযরাক্বী রচিত ‘আখবা’র মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আ’সার’, ২:১৮০; আল-নববী প্রণীত ‘তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল-লুগা’ত’, ৩:৩৩৩; এবং আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ৩:৭]     
’রামী’ তথা পাথর নিক্ষেপের রীতির মতোই ’সা’ঈ’ ও ’তালবিয়্যা’ প্রথাগুলোও আল্লাহতা’লার নেয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের সম্মানার্থে উদযাপিত আমল। অনুরূপভাবে, ‘আরাফা’ত’ ও ‘মুযদালিফা’ স্থানগুলোও সম্মানিত হয়েছে, যেহেতু বাবা আদম (আ:) ও মা হাওয়া (রা:) দীর্ঘকাল পরে সেখানে পুনরায় মিলিত হন। এখানে গুরুত্বারোপ করতে হবে যে, আক্ষরিক অর্খে ‘আরাফা’ত’ বলতে ’চেনা’কে বোঝায়, আর ‘মুযদালিফা’ মানে ’সান্নিধ্য’। মহান আল্লাহতা’লা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্মিলনের স্মৃতি প্রতি বছর যেলহজ্জ্ব মাসের ৯ তারিখে কীভাবে সেখানে হাজ্বী সাহেবানের উপস্থিতিকে বাধ্যতামূলক করে দিয়ে পুনর্জাগরিত করেছেন, তা গভীরভাবে ভেবে দেখুন।
১.১৭ আরাফাত ও মুযদালিফায় আদায়কৃত নামাযের একত্রীভবন: মহানবী (দ:)-এর সুন্নাহ
মুসলমানবৃন্দ আল্লাহতা’লার ইচ্ছা মোতাবেক সর্বদা নির্দিষ্ট ওয়াক্তের নামায যথাসময়ে আদায় করে থাকেন। কিন্তু (এর ব্যতিক্রমস্বরূপ) আরাফাতের ময়দানে হাজ্বী সাহেবান যোহর ও আসর ওয়াক্তের নামায একত্রে পড়েন। এটা শুধু এ কারণেই যে প্রিয়নবী (দ:) এই দুই ওয়াক্তের নামায একত্রে পড়েছিলেন; আর তাই হাজ্বী সাহেবানের প্রতি অনুরূপ রীতি পালনের (শরঈ) বিধান জারি করা হয়। একইভাবে, সূর্য ডোবার সাথে সাথে হাজ্বী সাহেবান মাগরেব ও এশা’র নামায-ও একত্রে পড়েন। তাঁরা সরাসরি নামায আদায় করেন না, বরং মুযদালিফায় না পৌঁছুনো পর্যন্ত তাঁরা অপেক্ষা করেন। এটা নিম্নের রওয়ায়াত দ্বারা সপ্রমাণিত:
১. মুহাদ্দেসীনে কেরাম হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:) হতে মহানবী (দ:)-এর বিদায়ী হজ্জ্ব সম্পর্কে একটি বিশদ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) আরাফাত ময়দানে এক আযান ও দুই এক্বা’মত সহকারে যোহর ও আসরের নামায একত্রে আদায় করেছিলেন, আর মুযদালিফায় মাগরেব ও এ’শার নামাযের ক্ষেত্রেও একই রকম করা হয়েছিল। [মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘মহানবী (দ:)-এর হজ্জ্ব’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৮৮৬-৮৯২ #১২১৭; এবং আবূ দাউদ লিখিত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক’, রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হজ্জ্বের বিবরণ’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৮৫ #১৯০৫]
২. ইমাম জা’ফর আল-সা’দিক্ব (রহ:) তাঁর পিতা ইমাম বা’ক্বির (রহ:) হতে বর্ণনা করেন: হুযূর পূর নূর (দ:) আরাফা’তে যোহর ও আসরের নামায এক আ’যা’ন ও দুইটি এক্বা’মত সহকারে (একত্রে) আদায় করেন। তিনি উভয়ের মাঝে আল্লাহ পাকের কোনো ‘তাসবীহ’ (প্রশংসা-বাক্য) পাঠ করেননি। অতঃপর তিনি এক আ’যা’ন ও দুইটি এক্বা’মত সহকারে মাগরেব ও এ’শার নামাযও (মুযদালিফায়) আদায় করেন এবং সেখানেও তিনি উভয়ের মাঝে কোনো তাসবীহ পাঠ করেননি। [আবূ দাউদ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক’, ‘রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হজ্জ্বের বিবরণ’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৮৬ #১৯০৬; এবং আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ১:৪০০ #১৭৪১]
৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা:) বলেন: আমি কখনোই রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে নামায তার নির্দিষ্ট ওয়াক্ত ছাড়া পড়তে দেখিনি (মানে নামায তরক করেননি); ব্যতিক্রম শুধু (হজ্জ্বের সময়) দুইটি নামায – মাগরেব ও এশা’ একত্রে আদায়। [মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘মুযদালিফায় নাহর দিবসে অন্ধকার থাকতে ফজরের নামায আদায়ের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৩৮ #১২৮৯; এবং আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘জাম’ (মুযদালিফা)-এ ফজরের নামায পড়ার সময়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯০৪ #১৫৯৮]
ক্বুরআ’ন মজীদে যদিও নামায সুনির্দিষ্ট ওয়াক্ত অনুযায়ী আদায়ের হুকুম রয়েছে [আল-ক্বুরআ’ন ৪:১০৩], তবুও হজ্জ্বের সময় আরাফা’ত ও মুযদালিফায় এই সাধারণ আদেশের ব্যতিক্রম করা হয়েছে। এটা প্রিয়নবী (দ:)-এর অনুশীলিত রীতির কারণেই হয়েছে।
১.১৮ পশু কুরবানি: পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর স্মরণে
হজ্জ্বের রীতি পালন করতে হাজ্বী সাহেবান এবং পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর সুন্নাহ’র (স্মারক) উদযাপন করতে বিশ্বব্যাপী মুসলমান সর্বসাধারণ ঈদুল আযহা’র দিন পশু কুরবানি দেন। এই কুরবানী মূলতঃ হযরত ইবরাহীম (আ:) কর্তৃক তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ:)-কে আল্লাহতা’লার রেযামন্দির খাতিরে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকারই স্মৃতিচারণমূলক আমল বা নেক কাজ। (তাঁর) এই কুরবানির এতোখানি সযত্ন মূল্যায়ন হয়েছিল যে এর ফলশ্রুতিতে প্রতি বছর হজ্জ্বে হাজ্বী সাহেবানকে একটি করে কুরবানি দিতে (খোদায়ী) নির্দেশ জারি করা হয়। শুধু হাজ্বী সাহেবান-ই নন, প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের প্রতিও আল্লাহতা’লার ওয়াস্তে পশু কুরবানি দেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
ইমাম হাসান আল-বসরী (২১-১১০ হিজরী) বলেন: পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর পরিবর্তে ‘সাবীর’ উপত্যকায় (মক্কা পাহাড়ে) একটি বড় ও হৃষ্টপুষ্ট মদ্দা ভেড়া/দুম্বা কুরবানি দেয়া হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ এরশাদ ফরমান, “আমি তার (ইসমাঈল আলাইহিস সালামের) স্থলে উৎসর্গস্বরূপ একটি বড় (পশু) কুরবানি (গ্রহণ) করি” [আল-আয়াত]। হযরত ইসমাঈল (আ:)-এর কুরবানির পরিবর্তে ভেড়া জবাইকেই এই (ঐশী) কুরবানি নির্দেশ করেছে। এতদসত্ত্বেও শেষ বিচার দিবস অবধি প্রতি বছর পশু কুরবানি দেয়ার জন্যে এই উম্মতকে আদেশ করা হয়েছে। (ইমাম হাসান আল-বসরী এরপর শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেন) ‘ওহে মানুষ, তোমাদের জানা উচিত যে এই কুরবানি ইন্তেক্বালপ্রাপ্তদেকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, আর তাই তোমাদেরও এই কুরবানি করা উচিত!’ [আল-তাবারী প্রণীত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল মুলূক’, ১:১৬৭; আল-তাবারী কৃত ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ২৩:৮৭-৮৮; এবং আল-ফা’কাহী রচিত ‘আখবার মক্কা ফী ক্বাদীম আল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ৫:১২৪]
এই আমল (পুণ্যদায়ক কর্ম) নিঃসন্দেহে সর্ব-পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:)-এর মহা কুরবানিরই উদযাপন, যার দরুন ঈমানদারবৃন্দ প্রত্যাশা অনুযায়ী এ দ্বীনের মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করতে পারেন এবং ফলস্বরূপ আল্লাহতা’লার রেযামন্দির খাতিরে নিজেদের জান ও মাল সমর্পণ করতে প্রস্তুত থাকেন।
১.১৮.১ কুরবানির পশু: আল্লাহর চিহ্নগুলোর একটি
সারা বিশ্বে যদিও পশু জবাই হয়ে থাকে, তবুও পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর স্মরণে পশু কুরবানি হওয়া একটি অনন্য ঘটনা। এগুলোকে আল্লাহতা’লার ‘শ’আয়ের’ বা চিহ্ন বলা হয়েছে সুস্পষ্টভাবে। এরশাদ হয়েছে: “এবং ক্বোরবানির মোটাতাজা পশুকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম করেছি।” [আল-ক্বুরআ’ন, ২২:৩৬]
আজকে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর এই সুন্নাত পশু কুরবানি দ্বারা পুনর্যাপিত হচ্ছে। এটা একটা পুণ্যদায়ক কর্ম এবং আল্লাহতা’লার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
১.১৯ কঙ্কর নিক্ষেপ প্রথা: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর সুন্নাহ  
হাজ্বী সাহেবান (হজ্জ্বের অংশ হিসেবে) তিন দিন মিনা’তে অবস্থান করেন এবং তাঁরা সেখানে ‘জামারা’ত’ নামে পরিচিত স্তম্ভগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এই আমলটি পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মৃতি রক্ষার্থে পালিত হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: হযরত জিবরীল আমীন (আ:) পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে ‘জামরা আল-’আক্বাবা’য় নিয়ে গেলে সেখানে শয়তানের আবির্ভাব ঘটে। হযরত ইবরাহীম (আ:) সাতটি কঙ্কর তার দিকে ছুঁড়ে মারেন, যার দরুন শয়তান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ‘জামরা আল-উসতা’য় অগ্রসর হলে শয়তান আবারো (দ্বিতীয়বার) আবির্ভূত হয়। তিনি তার দিকে (পুনরায়) সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলে শয়তান পুনরায় মাটিতে পড়ে যায়। অতঃপর পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ‘জামরা আল-ক্বুসওয়া’য় অগ্রসর হলে শয়তান আবারো (তৃতীয়বারের মতো) আবির্ভূত হয়। হযরত ইবরাহীম (আ:) পুনরায় সাতটি কঙ্কর তার দিকে নিক্ষেপ করেন, যার ফলে শয়তান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। [আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৩০৬; আল-হা’কিম কৃত ‘আল-মোসতাদরাক’, ১:৬৩৮ #১৭১৩; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৫৩ #৯৪৭৫; আল-মাক্বদাসী লিখিত ‘আল-আহা’দীস আল-মুখতা’রা’, ১০:২৮৩ #২৯৬; আল-মুনযিরী রচিত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিনাল-হাদীস আল-শরীফ’, ২:১৩৪ #১৮০৭; এবং আল-হায়সামী কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৩:২৫৯]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) স্বয়ং বলেন: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে হজ্জ্বের রীতিনীতি পালনের আদেশ দেয়া হলে পরে হযরত জিবরীল (আ:) তাঁকে ‘জামরা আল-আক্বাবা’য় নিয়ে যান। সেখানে শয়তানের আবির্ভাব ঘটে। হযরত ইবরাহীম (আ:) তার দিকে (একে একে) সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন যতোক্ষণ না সে পালিয়ে যায়। ‘জামরা আল-’উসতা’য়ও সে আবার দেখা দেয়, আর ইবরাহীম (আ:) তার দিকে আবার সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। [অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহূ একটি ক্বুরআ’নের আয়াত তেলাওয়াত করেন যা ঘোষণা করে, “এবং পিতা ইবরাহীম পুত্র ইসমাঈলকে মাথার ওপর ভর করে শায়িত করলো” (আল-ক্বুরআ’ন, ৩৭:১০৩)]। পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) একটি সাদা রংয়ের জামা পরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাবা, কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহারের জন্যে আমার তো কোনো কাপড় নেই। অতএব, অনুগ্রহ করে এই জামাটি আমার শরীর থেকে অপসারণ করুন, যাতে আপনি এটা দিয়ে আমাকে দাফন-কাফন করতে পারেন।’ হযরত ইবরাহীম (আ:) যেই তা সরাতে যাবেন, অমনি তিনি এক গায়েবী কণ্ঠস্বর শুনতে পান যা ঘোষণা করে, “হে ইবরাহীম! নিশ্চয় তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে” [প্রাগুক্ত আল-ক্বুরআ’ন, ৩৭:১০৪-১০৫]। হযরত ইবরাহীম (আ:) ঘুরে তাকিয়ে দেখেন একটি সুন্দর, বড় চোখবিশিষ্ট সাদা মদ্দা ভেড়া দাঁড়িয়ে আছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) (প্রসঙ্গতঃ) বলেন, “আমরা এ ধরনের ভেড়া/দুম্বা একই জায়গায় বিক্রি করতাম।” অতঃপর তিনি আরো বলেন, “হযরত জিবরীল ফেরেশতা (আ:) পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে ‘জামরা আল-ক্বুসওয়া’য় পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলে সেখানে শয়তান আবির্ভূত হয়। হযরত ইবরাহীম (আ:) তার দিকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলে সে পালিয়ে যায়। [আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯৭; আল-তাবারা’নী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ১০:২৬৮ #১০,৬২৮; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৫৩-১৫৪; আল-হায়সামী লিখিত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৩:২৫৯; আল-তাবারী রচিত ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ২৩:৮০; এবং ইবনে কাসীর কৃত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-’আযীম’, ৪:১৬]
হযরত ইবরাহীম (আ:) শয়তানের দিকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় যুগপৎভাবে আল্লাহর ‘তাকবীর’ (শ্রেষ্ঠত্ব) পাঠ করেছিলেন। এর প্রমাণস্বরূপ হযরত মুজাহিদ ইবনে যুবায়র (বেসাল: ১০৪ হিজরী) বলেন: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) হযরত জিবরীল ফেরেশতা (আ:)-এর সাথে অগ্রসর হন। ‘জামরা আল-’আক্বাবা’ অতিক্রমকালে শয়তানের আবির্ভাব ঘটে। হযরত জিবরীল (আ:) বলেন, ‘আপনি তাকবীর পাঠ করে পাথর নিক্ষেপ করুন।’ শয়তান আবারো ‘জামরা আল-ক্বুসওয়া’য় দেখা দিলে জিবরীল ফেরেশতা (আ:) আবারো পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে বলেন, ‘তাকবীর পাঠ করে তাকে পাথর নিক্ষেপ করুন।’ [আল-আযরাক্বী প্রণীত ‘আখবা’র মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আ’সার’, ১:৬৮]    
শয়তানের দিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা শুধু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এরই সুন্নাত নয়, বরঞ্চ এটা পয়গম্বর আদম (আ:)-এরও সুন্নাত। ইমাম আল-কালবী লেখেন: জিমা’র (কঙ্কর যে স্থানটিতে নিক্ষেপ করা হয়) নামকরণ হয়েছে, কেননা পয়গম্বর আদম (আ:) ইবলীস শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করতেন যখনই সে তাঁর সামনে থেকে পালাতে থাকতো। [আল-আযরাক্বী রচিত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র’, ২: ১৮১]
সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার প্রিয় বান্দার হাতে হাজার হাজার বছর আগে সংঘটিত এই কাজটি মহাপ্রভুর কাছে এতোই সন্তুষ্টির ছিল যে তিনি এই উম্মতের প্রতি (হজ্জ্বের রীতি হিসেবে) তা আবারো পালনের আদেশ জারি করেন। এটা হজ্জ্বের প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে যায়; যা ব্যতিরেকে হজ্জ্ব অসম্পূর্ণ রবে।
এই আমল উদ্দেশ্য ও অর্থহীন নয়। কেননা, এটা আমাদেরকে তিনটি বিষয় শিক্ষা দেয়:
(১) আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামের সুন্নাতের ধারাবাহিকতা;
(২) এ কাজের অনুকরণের ফলে আম্বিয়া (আ:)-এর প্রতি মহব্বত ও আনুগত্য প্রকাশ হয়;
(৩) শয়তানের প্রতিনিধিত্বকারী স্তম্ভের দিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে মুসলমানবৃন্দ শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন।
এই পুরো আলোচনার সারমর্ম হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার কথা স্মরণ করে আবেগের বহিঃপ্রকাশ কেবল শরীয়তে জায়েয-ই নয়, বরং এটা মহান আল্লাহতা’লার আরোপিত একটি রীতি-ও। এরই আলোকে মুসলমান সর্বসাধারণ যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি প্রকাশার্থে ধর্মীয় সভা-সমাবেশ/মাহফিলের আয়োজন করেন, তাহলে তা সম্পূর্ণ জায়েয বা বৈধ হবে।
এসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন মহানবী (দ:)-এর সাথে আমাদের আত্মিক বন্ধন সৃদৃঢ় করে থাকে এবং তাঁর প্রতি আমাদের এশক্ব-মহব্বত ও বিশ্বাস-ও বৃদ্ধি করে বটে। প্রেমাস্পদকে স্মরণ করা এবং তাঁর মহব্বতে বিলীন হওয়া এমনই সব আহওয়াল (আধ্যাত্মিক অবস্থা) যা আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত মূল্যায়িত একটি বিষয়। খালেস নিয়্যতে তথা সৎ উদ্দেশ্যে পবিত্র কা’বায় হজ্জ্বে গমন পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর প্রতি আমাদের স্মৃতি জাগরূক রাখে, আর এরই ফলে মহান আল্লাহতা’লা আমাদের ছোট-বড় সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন [হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহূ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বাণী উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন, ‘যে কেউ হজ্জ্ব পালন করলে, এবং কোনো অশোভনীয় আচরণ বা অপরাধ না করলে, সে তার মায়ে তাকে জন্ম দেয়ার দিনের মতোই নিষ্পাপ হয়ে যায়।’ এই হাদীসটি রওয়ায়াত করেছেন আল-বুখারী নিজ ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘ক্ববূল হজ্জ্বের গুণাবলী’ শীর্ষক অধ্যায়, ২: ৫৫৩ #১৪৪৯ গ্রন্থে; ইবনে আল-জা’আদ তাঁর ‘আল-মুসনাদ’, পৃষ্ঠা ১৪১ #৮৯৬ পুস্তকে; ইবনে মুনদাহ আপন ‘আল-ঈমান’, পৃষ্ঠা ৩৯২ #২৩০ বইয়ে; আল-মাক্বদিসী তাঁর ‘ফাদা’য়েল আল-আ’মাল’, পৃষ্ঠা ৮১ #৩৪৭ কিতাবে; এবং আল-তাবারী নিজ ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ২:২৭৭ পুস্তকে]। সে তুলনায় মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি যে মুসলমান-ব্যক্তি সালাত-সালাম পেশ করেন এবং হুযূরে পূর নূর (দ:)-এর সাথে নিজ আত্মিক বন্ধন সুদৃঢ় করেন, তাঁর জন্যে কী (ঐশী) পুরস্কার মঞ্জুর হতে পারে? বস্তুতঃ রাসূল-প্রেম ঈমানের সার তথা নির্যাস নয় কি?
১.১৯.১ একটি আপত্তি
অনেক মানুষ আছেন যারা মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন করেন না। তাদের আপত্তি হলো, মহানবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের উদযাপন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কেননা, তাঁকে প্রেরণের (ঐশী) উদ্দেশ্য আমাদেরকে সঠিক পথপ্রদর্শন ও শরীয়তের জ্ঞান শিক্ষা দান ছাড়া কিছু নয়। তাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত তাঁরই শিক্ষার অনুসরণে কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আমাদের জীবন যাপন করা এবং অন্যদেরকেও একই রকম করতে বলা। এই আপত্তি উত্থাপনকারীদের মতে, মওলিদ উদযাপন স্রেফ পণ্ডশ্রম এবং সময়েরও অপচয়।
১.১৯.২ আপত্তির প্রতি আমাদের জবাব
এব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মহানতম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যে তাঁর সুন্নাহ-রূপী হেদায়াতের আলো দ্বারা আমাদেরকে আশীর্বাদধন্য করতে (আল্লাহতা’লা কর্তৃক) প্রেরিত হয়েছিলেন এবং দ্বীন-ইসলাম যে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, সে কথা অস্বীকার করার জো নেই। এ বিষয়ে কোনো মতপার্থক্য-ই নেই। হুযূর পাক (দ;)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ এবং ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন যাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে আমাদের প্রতি। আর আমরাও খোদাতা’লার অনুগ্রহ ও দয়ায় ইসলাম ধর্মকে প্রতিষ্ঠার জন্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যবহারিকভাবে সংগ্রাম বা সাধনা  করেছি। আমরা যে ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করছি, তা হচ্ছে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যের ব্যাপারে, আর এটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা বিষয়।
রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এবং তা অনুসরণ করার কোনো আলোচনাই এখানে নিহিত নেই, কেননা সেটা ধর্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে (ধর্মের) আরো অনেক দিক রয়েছে। ধর্মের মধ্যে শুধু আমল (নেক কাজ) অন্তর্ভুক্ত নয়, বরঞ্চ এতে এশক্ব-মহব্বত ও ভক্তির মতো আবেগ-ও বিদ্যমান। আর এই দিকটির সাথেই মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বিষয়টি (গভীরভাবে) সম্পর্কিত।
মহান প্রভু আল্লাহতা’লা তাঁরই রাসূল (দ:)-কে আমাদের মাঝ হতে আবির্ভূত করে আপন সর্ববৃহৎ নেয়ামত (মানে আশীর্বাদ) মানব সভ্যতার প্রতি মঞ্জুর করেছেন। যেদিনটিতে তাঁর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হয়, সেদিনটি মহা আনন্দের এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও বটে। (খোদায়ী) আশীর্বাদরূপী বিশ্বনবী (দ:)-এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি তাঁরই করুণা ও অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন। এই কারণেই হুযূরে পূর নূর (দ:)-এর বেলাদত দিবস উদযাপন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মহামূল্যবান একটি কাজ। এটা এমন-ই এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অবহেলা বা অবজ্ঞা করার মতো নয়।
আমাদের যুগ হতে হাজার হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা রয়েছে, যেগুলোতে (ঐশী) শিক্ষা বিদ্যমান। হজ্জ্বের রীতিগুলোই ধরুন, প্রথম নজরে এর বিভিন্ন রীতির মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক-ই (খুঁজে) পাওয়া যাবে না। দৃশ্যতঃ এগুলো বিচ্ছিন্ন বা পৃথক পৃথক ঘটনা, যেগুলো এখন অতীত। ব্যবহারিক অর্থে এসব ঘটনা আমাদের জন্যে কী শিক্ষা বহন করে? অতএব, এ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে ইসলাম ধর্ম উভয় বাস্তবতাকেই দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করে: দ্বীন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে ঐশী বিধানের সাথে সম্পর্কিত ধর্মীয় শিক্ষার দিকগুলো যেমন দ্বীন-ইসলাম তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করে, ঠিক তেমনি আবেগের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে, যেটা আমাদের মন ও মগজে ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃৃতি জাগরূক রেখে আমাদেরই জীবনে ভূমিকা পালন করে থাকে। সার কথা হলো, ইসলাম ধর্ম অতীত ঘটনাবলীকে দেখে থাকে দুইটি দৃষ্টিকোণ থেকে: ব্যবহারিক/বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি এবং আবেগের দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে অন্তহীন খুশি প্রকাশ হচ্ছে এর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়। অর্থাৎ, এই ঘটনা আমাদের স্মৃতিপটে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে কখনোই বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। তাই মওলিদুন্নবী (দ:)-এর শুভলগ্নে খুশি ও আনন্দের পরিবেশ বিরাজ করে। ওর প্রাপ্য সম্মান দেয়ার জন্যেই তা করা হয়।
এই বইয়ের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলো হতে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে যে হজ্জ্বের রীতিগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতা’লার প্রিয় ও আশীর্বাদধন্য বান্দাদের জীবনের সাথে জড়িত ঘটনাসংশ্লিষ্ট বিষয়। এসব ঘটনার স্মৃতি খোদাতা’লার নিদর্শনস্বরূপ সংরক্ষিত হয়েছে। এব্যাপারে যদি কোনো ভিন্নমত বা মতপার্থক্য না থাকে, তাহলে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ব্যাপারেও কোনো আপত্তি আর থাকা উচিত নয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়
আনন্দ ও বিষাদময় ঘটনার স্মরণে
বিশ্বনবী (দ:)-এর বেলাদত (অর্থাৎ, ধরাধামে শুভাগমন) ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা। এই দিনেই বিশ্বজগতের প্রতি খোদার (অসীম) করুণা (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এ ধরণীতলকে নিজ তাশরিফ তথা শুভাগমন দ্বারা আশীর্বাদধন্য করেন। খুশি প্রকাশের জন্যে এর চেয়ে শ্রেয়তর দিন অার কোনোটাই হতে পারে না। সুখ ও হতাশা, শান্তি ও শঙ্কা, আশা ও নিরাশা হচ্ছে মানব জীবনের সেসব দিক, যেগুলো ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে প্রত্যেকের মন-মানসিকতাকে রূপায়ন করে থাকে। মহান আল্লাহতা’লা তাঁর নেয়ামত বর্ষণের মাধ্যমে অতীতকালের জাতিগুলোকে সুখ-শান্তির ঐশ্বর্য দ্বারা সমৃদ্ধ করেছিলেন, আবার তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য হওয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাপারেও তিনি তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন।
হেদায়াত তথা সত্য ও সঠিক পথের দিকে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত। কোনো ব্যক্তির অন্তরে সততারূপী বীজ যতোক্ষণ না বেড়ে ওঠে, ততোক্ষণ তার যাবতীয় কর্ম ফলদায়ক হবে না। কিন্তু যখন কেউ আধ্যাত্মিক হাল তথা অবস্থাগুলো অর্জন করেন এবং তাঁর মন ও মগজ আলোকিত হয়, তখন হেদায়াতের জ্যোতি তাঁর প্রতি বিচ্ছুরিত হয়; আর এই নূর তথা জ্যোতি দ্বারা তিনি জীবনের যাত্রাপথ লম্বা লম্বা কদমে পার হয়ে যান।
এসব অবস্থা হতে উপকার পেতে হলে প্রত্যেককে স্বীকার করতে হবে যে এগুলোর উৎস তারই চেনাজানাদের সাথে সম্পর্কিত। পয়গম্বর এয়া’ক্বূব (আ:) পুত্রবিচ্ছেদের শোকে দৃষ্টিশক্তি হারান। আল্লাহতা’লার এই পয়গম্বর (ওই সময়) শোকে মূহ্যমান অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু যখন (তাঁর পুত্র) পয়গম্বর ইউসূফ (আ:) নিজের জামাটি আপন পিতার চোখের ওপর রাখার জন্যে প্রেরণ করেন, তখন হযরত এয়াক্বূব (আ:)-এর শোক পরিণত হয় সুখে এবং তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ফিরে আসে। এমতাবস্থায় তাঁর অবস্থা ধৈর্য হতে কৃতজ্ঞতায় রূপ নেয়। অতএব, এটা পরিস্ফুট যে, এ ঘটনা চেনাজানার সম্পর্কের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। কেননা, জামাটি ছিল পয়গম্বর ইউসূফ (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত।
অনুরূপভাবে, আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঘটনা ঘটে থাকে, যা ওই ধরনের সম্পর্ককে ঘিরে আবর্তিত। আমাদের ঘরে বিভিন্ন জিনিস বিরাজমান, যেগুলো পূর্ববর্তী প্রজন্ম পরম্পরায় আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে; এ ধরনের জিনিসকে শিল্পকর্ম হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে, যেগুলোকে এমন কি স্পর্শ করলেও স্মৃতির রোমন্থন হয়। একইভাবে, আমাদের আনন্দ-বেদনার অনুভূতিগুলো-ও ওই ধরনের চেনাজানার সাথে সম্পর্কিত, আর এসব চেনাজানা হতেই আমাদের অন্তস্থিত (আত্মিক) অবস্থাগুলোর উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে থাকে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আহাদীস তথা পবিত্র বাণীতে বহু বাস্তব ঘটনার বর্ণনা বিদ্যমান, যেগুলোতে মহানতম পয়গম্বর (দ:) নিজের অনুশীলিত কর্ম দ্বারাই এই উম্মতকে আনন্দ ও বেদনাময় অবস্থাগুলোর স্মরণার্থে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর স্মৃতিচারণ শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা যদি গভীরভাবে এসব ঘটনা সম্পর্কে চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাবো যে খুশিপূর্ণ ও বিষাদময় অবস্থাগুলো কোনো নির্দিষ্ট চেনাজানা কারোর সাথে সংশ্লিষ্টতারই ফসল, যা তাঁর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মহানবী (দ:)-এর হাদীসে উল্লেখিত এরকম কিছু ঘটনা নিচে দেয়া হলো:
২.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর দিবসের স্মরণে
মহানবী (দ:) মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করার পর সেখানে বসবাসরত ইহুদীদের তিনি ১০ই মহররম তারিখে তাদের রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, এই দিনে আল্লাহতা’লা ফেরাউনকে পানিতে ডুবিয়ে পয়গম্বর মূসা (আ:)-কে বিজয় দান করেন। ফেরাউনের দুঃশাসন ও অত্যাচার-নিপীড়ন হতে এ দিনেই ইসরাঈল জাতি মুক্তি লাভ করে। এই কারণে পয়গম্বর মূসা (আ:) আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দিনটিতে রোযা রাখেন। তাই আমরাও এ দিনে রোযা রাখি। রাসূলুল্লাহ (দ:) ইহুদীদের এই জবাব শুনে বলেন, আমি তোমাদের চেয়ে মূসা (আ:)-এর বেশি ঘনিষ্ঠ (দুই জনই আল্লাহর পয়গম্বর হওয়ার সূত্রে)। অতঃপর প্রিয়নবী (দ:)-ও ১০ই মহররম তারিখে নিজে রোযা রাখা আরম্ভ করেন এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকেও অনুরূপ রোযা পালন করতে আদেশ দেন। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-সওম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৯০০; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর কালাম: মূসা (আ:)-এর সংবাদ তোমাদের কাছে পৌঁছেছে কি?’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৪৪ #৩২১৬; আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব ফাযা’য়েল আল-সাহা’বা’, ‘মহানবী (দ:) মদীনায় এলে ইহুদীদের তাঁর কাছে আগমন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১৪৩৪ #৩৭২৭; মুসলিম প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-সিয়া’ম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭৯৫-৭৯৬ #১১৩০; আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সওম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৩২৬ #২৪৪৪; ইবনে মা’জাহ কৃত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সিয়া’ম’, এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫৫২ #১৭৩৪; আহমদ ইবনে হাম্বল লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯১ ও ৩৩৬ #২৬৪৪ ও ৩১১২; এবং আবূ এয়া’লা’ রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৪৪১ #২৫৬৭]
এ থেকে পরিস্ফুট হয় যে ইসরাঈল বংশ (তাদের) এই জাতীয় জীবনের ঘটনায় খুশি প্রকাশ করতে দিনটির স্মরণে রোখা রেখেছিল; আর মহানবী (দ:)-ও সেই ঘটনার ব্যাপারে তাঁর খুশি প্রকাশার্থে একইভাবে রোযা রেখে দিনটিকে স্মরণ করেন।
২.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)-এর দিবসের স্মরণে
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিজরী) ও হাফেয ইবনে হাজর আল-আসক্বালা’নী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) ‘এয়াওমে আশূরা’ (আশূরা দিবস) সম্পর্কে হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) হতে এ মর্মে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় বর্ণনা করেন যে, ওই দিনটিতে আল্লাহতা’লা পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর সাথীদের প্রতিও নিজ অনুগ্রহ বর্ষণ করেন; কেননা ওই দিনেই তাঁরা কিস্তি থেকে ‘জূদী’ পর্বতশৃঙ্গে অবতরণ করেন। এরপর থেকে পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর সাথীবৃন্দ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দিনটি পরবর্তী প্রজন্মগুলোর দ্বারা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। এই দিনে মহানবী (দ:)-ও রোযা রাখেন এবং তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কেও রোযা রাখার নির্দেশ দেন। [আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৩৫৯-৩৬০ #৮৭০২; এবং আল-আসক্বালা’নী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৭]
২.৩ ইসলাম-ধর্মের পূর্ণতাপ্রাপ্তির দিবস: খুশি উদযাপনের দিন (ঈদ)
হযরত কা’আব আল-আহবার (রা:) বর্ণনা করেন যে তিনি খলীফা হযরত উমর বিন আল-খাত্তা’ব (রা:)-কে বলেন, “আমি এমন এক জাতি সম্পর্কে জানি যাদের প্রতি এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলে তারা ওই দিনটিকে (মানে আয়াত নাযেলের দিনটিকে) ঈদ হিসেবে উদযাপন করতো।” হযরত উমর ফারূক (রা:) জিজ্ঞেস করেন, “সেটা কোন্ আয়াত?” হযরত কা’আব (রা:) উত্তর দেন, “আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন (পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা) মনোনীত করলাম।” [আল-ক্বুরআন, ৫:৩]
অতঃপর হযরত উমর (রা:) বলেন, “এই আয়াতটি  (‘আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম’) যেদিন নাযেল হয় সেদিনটি সম্পর্কে আমি জানি: সেদিনটি ছিল ‘আরাফা এবং শুক্রবার; আর উভয়-ই (ইতোমধ্যে) আমাদের জন্যে ঈদের দিনে পরিণত হয়েছে।” [আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম অাল-আওসাত’, ১:২৫৩ #৮৩০; আল-আসক্বালা’নী কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ১:১০৫ #৪৫; এবং ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-আযীম’, ২:১৪]
এখানে হযরত কা’আব (রা:)-ই তাঁর ভাবনাকে ভাষায় প্রকাশ করেন এ মর্মে যে, এই সুসংবাদ প্রাপ্তির দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আর হযরত উমর ফারূক (রা:)-ও তা অনুমোদন এবং এর সত্যতা প্রতিপাদন করেন। এ দৃষ্টান্ত থেকে এটা শেখা যায় যে আমাদের (অর্থাৎ, মুসলমানদের) জাতীয় ও সম্প্রদায়গত জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব থাকায় সেগুলোকে ঈদের মতো করে উদযাপন করা উচিত। এ কাজটি ক্বুরআন ও সুন্নাহর নীতির পরিপন্থী নয়। বরঞ্চ তা একটি (শরীয়ত)-সমর্থিত পুণ্যদায়ক আমল, যেটা জাতীয় ও সম্প্রদায়গত দৃষ্টিকোণ হতে গুরুত্বপূর্ণ। [খুশি উদযাপনের ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে এই বইয়ের পঞ্চম অধ্যায় দেখুন]
২.৪ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নির্দেশ
নবম হিজরী সালে তাবূকের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সময় মুসলমান বাহিনী দুটো কুয়ো অতিক্রম করেন, যেগুলো ইতিপূর্বে সামূদ গোত্রের মালিকানাধীন ছিল। এই স্থানটি সম্পর্কে প্রিয়নবী (দ:) বলেছিলেন যে পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর জাতি এখানেই একটি মাদী উটকে হত্যা করেছিল, যার ফলে আল্লাহতা’লা তাদেরকে শাস্তি দেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে দুটো কুয়োর মধ্যে শুধু একটি হতে পানি সংগ্রহের অনুমতি দেন, যাতে তাঁদের চাহিদা মেটে; অপর কুয়োটি হতে পানি সংগ্রহ করতে তিনি তাঁদের বারণ করেন।
যে কুয়োটি হতে মহানবী (দ:) তাঁর পুণ্যাত্মা সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে পানি সংগ্রহের নির্দেশ দেন, সেটা থেকেই ওই উটনী ইতিপূর্বে জলপান করতো। তার জন্যে পানি পানের দিন (আলাদাভাবে) বরাদ্দ থাকলেও সামূদ গোত্রের লোকেরা এটা বরদাশত্ করতে অক্ষম হয়ে উটনীকে পেশীতন্তু কেটে হত্যা করে।
(পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) ওই উটনীকে হত্যার এ ঘটনাটি ঘটেছিল বহু শতাব্দী আগে, আর নিঃসন্দেহে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাবৃন্দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’লা আনহুমের সময়কাল নাগাদ সেই কুয়োটিরও পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল; কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (দ:) সেটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কুয়োটি পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর উটনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল, আর এর আশীর্বাদসূত্রে প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে এটা থেকে পানি সংগ্রহ করতে বলেন। পক্ষান্তরে, সামূদ গোত্রের লোকেরা অপর যে কুয়োটির পানি ব্যবহার করতো, মহানবী (দ:) নিজ সাহাবামণ্ডলী (রা:)-কে সেটার পানি ব্যবহার করতে বারণ করেন। কেননা, সামূদ গোত্র এরই সূত্রে আল্লাহর শাস্তির সতর্ক-বার্তা শুনতে পেয়েছিল। তাদের ওই বিশ্বাসঘাতকতার (উটনীকে হত্যা) দরুন আল্লাহ পাক তাদেরকে শাস্তি দেন এবং ফলশ্রুতিতে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ বিষয়টি স্মরণে রেখেই হুযূর পূর নূর (দ:) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে ওই কুয়োর পানি ব্যবহার করতে মানা করেন।
এই নিষেধাজ্ঞা জারির আগে পুণ্যবান সাহাবা (রা:)-বৃন্দের একটি দল নিজেদের অজ্ঞাতসারে ‘সামূদ’ গোত্রের ওই কুয়ো থেকে পানি ব্যবহার করেছিলেন। এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে শোনার পর তাঁরা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন এই মর্মে যে তাঁরা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে না জেনেই ইতোমধ্যে ওই পানি ব্যবহার করেছেন। প্রিয়নবী (দ:) তাঁদেরকে ওই পানি এবং তা দ্বারা রান্নাকৃত সমস্ত খাবার ফেলে দিয়ে উটনীর সাথে সম্পর্কিত কুয়ো হতে সংগৃহীত পানি ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন।
এই ঘটনা সম্পর্কে আরো বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় নিম্নের আহাদীসগুলোতে:
২.৪.১ আল-হিজরে অবস্থিত সামুদের কুয়ো হতে পানি পানে নিষেধাজ্ঞা
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) বর্ণনা করেন, তাবূক জ্বিহাদের সময় রাসূলুল্লাহ (দ:) আল-হিজর এলাকায় যাত্রাবিরতি করেন এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে সেখানকার কুয়ো হতে পানি পান বা সংগ্রহ করতে মানা করেন। (কতিপয় সাহাবী) আরয করেন, ‘আমরা তা দিয়ে আটার কাই বানিয়েছি এবং (জন্তুর চামড়ানির্মিত) আমাদের পানির থলেগুলো-ও পূর্ণ করেছি।’ মহানবী (দ:) তাঁদেরকে আটার কাই ছুঁড়ে ফেলতে বলেন এবং কুয়োর পানিও ঢেলে ফেলে দিতে আদেশ করেন। [আল-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৬-১২৩৭ #৩১৯৮; আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’মিল ক্বুরআন’, ১০:৪৬; আল-বাগ্বভী রচিত ‘মু’আলিমুত্ তানযীল’, ২:১৭৮; ইবনে হাযম লিখিত ‘আল-মুহাল্লা’, ১:২২০; এবং আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘তাগলীক্ব আল-তা’লীক্ব’, ৪:১৯]
২.৪.২ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের সাথে সংশ্লিষ্ট কুয়ো হতে জলপানসম্পর্কিত আদেশ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন যে (সামূদ গোত্রের অধ্যুষিত) আল-হিজর এলাকায়  হুযূর পাক (দ:)-এর সাথে গমনকারী কিছু মানুষ সেখানকার কুয়ো থেকে পানি সংগ্রহ করে তা দ্বারা আটার কাই বানান এবং নিজেদের পানির থলেগুলো পূর্ণ করেন। মহানবী (দ:) তাঁর সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে ওই কুয়োর পানি ঢেলে ফেলে দিতে বলেন এবং আটার কাই তাঁদের উটগুলোকে খেতে দিতে আদেশ করেন। আর তিনি (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) উটনী যে কুয়ো থেকে পানি পান করতো, তা হতে পানি সংগ্রহ করতে বলেন। [আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব অাল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩১৯৯; মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘নিজেদের (আত্মার) প্রতি যুলূমকারীদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৬ #২৯৮১; ইবনে হিব্বা’ন লিখিত ‘আল-সহীহ, ১৪:৮২ #৬২০২; আল-বায়হাক্কী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ১:২৩৫ #১০৫০; এবং আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআন’, ১০:৪৬]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন যে তাবূকের যুদ্ধের বছর মুসলিম সেনাবাহিনী ‘সামূদ’ গোত্রের বসতির ধ্বংসাবশেষের পাশে তাঁবু ফেলেন। তাঁরা নিজেদের পাত্র সেখানকার কুয়োর পানি দ্বারা পূর্ণ করেন এবং আটার কাই বানান, আর গোশত-ও রান্না করেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) (এ সম্পর্কে জানতে পেরে) তাঁদেরকে ওই পানি ফেলে দিতে বলেন; আর তাঁরাও পানি ফেলে দেন এবং আটা নিজেদের উটগুলোকে খাওয়ান। অতঃপর হুযূর পাক (দ:) তাঁদেরকে (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস সালামের) ওই উটনী যে কুয়ো হতে জলপান করতো, সেখানে নিয়ে যান। তিনি তাঁদেরকে (সামূদ গোত্রের) শাস্তিপ্রাপ্ত সেসব লোকের বসতভিটায় প্রবেশ করতে মানা করে বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করি যে তাদেরকে যে শাস্তি আক্রান্ত করেছে, তা তোমাদেরকেও আক্রান্ত করতে পারে। অতএব, ওদের ঘরে প্রবেশ করো না।’ [আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:১১৭ #৫৯৮৪; এবং ইবনে হিব্বা’ন প্রণীত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৮৩ #৬২০৩; ইমাম আহমদ (রা:)-এর বর্ণনা সর্ব-ইমাম বুখারী (রহ:) ও মুসলিম (রহ:)-এর আরোপিত শর্ত পূরণ করেছে]
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শরীয়তের দৃৃষ্টিতে কুয়োর ওই পানি স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল না, বরং সুপেয় জল ছিল। কিন্তু (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) উটনী হত্যার দায়ে (ঐশী) শান্তিপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত হওয়ার একমাত্র কারণেই প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে তা ব্যবহার করতে বারণ করেন। এরই বিপরীতে অপর কুয়োটি পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর উটনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল। আর এই সম্পর্কের সূত্রেই কুয়োটিকে সম্মান দেয়া হয় এবং সেটাকে (ঐশী) করুণা ও আশীর্বাদের উৎস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। [বঙ্গানুবাদকের জরুরি জ্ঞাতব্য: লা’নতপ্রাপ্ত তথা অভিশপ্ত গোষ্ঠীর সাথে ওঠা-বসা, নামায-সমাজ ইত্যাদি বজায় রাখাও মুসলমানদের জন্যে এই দলিলে নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয়। এব্যাপারে উদাসীনতা পতনের কারণ হবে।]
২.৪.৩ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের স্মরণে
ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করে যে কোনো নবী (আ:) বা রাসূল (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত আশীর্বাদ স্থায়ী প্রভাব ফেলে। সেগুলোকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং সেগুলো হতে বরকত তথা আশীর্বাদ গ্রহণ করা এমনই এক শিক্ষা যা স্বয়ং মহানবী (দ:) প্রদান করেছেন। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো আলোচ্য কুয়োটি সে-ই কুয়ো, যেটা থেকে পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটটি পানি পান করতো; কিন্তু পয়গম্বর সালেহ (আ:) তা থেকে পানি পান করেছিলেন বলে উল্লেখিত হয়নি।
অতঃপর সহস্র সহস্র বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, আর আল্লাহ-ই ভালো জানেন ওই সময় হতে পানির কতোটুকু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, অথবা উটনীর পানকৃত জল এখনো আগের মতোই আছে কি না। তবে একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হচ্ছে আল্লাহতা’লার আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে একজনের মালিকানাধীন উটনীর সাথে কুয়োটির সংশ্লিষ্টতা। এই সংশ্লিষ্টতাকে এতোই উচ্চমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কুয়োর পানিকে শ্রদ্ধা করা হয়েছে এবং এর আশীর্বাদ-ও বহাল আছে।
২.৪.৪ সামূদের প্রতি বিধানকৃত শাস্তি স্মরণকালে দুঃখ প্রকাশ
সামূদ গোত্র কর্তৃক পৃথিবীর বুকে সর্বশেষ হাঁটার সময় হতে এ যাবত দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়েছে। এখন তাদের অার লেশচিহ্ন মাত্রও অবশিষ্ট নেই। যে বদনসিব তাদের আক্রান্ত করেছিল, তা-ও বর্তমানে দূর-অতীত। তথাপি রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে তাদের বসতভিটায় প্রবেশ করতে বারণ করেছিলেন এবং আরো আদেশ করেছিলেন যেন তাঁরা ওই ধ্বংসাবশেষ অতিক্রমের সময় দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে ও অশ্রুসজল নয়নে তা পার হন, যাতে মনে হয় শাস্তি এখনো তাঁদের ওপর পড়ছে।
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) উদ্ধৃত করেন মহানবী (দ:)-কে, যিনি এরশাদ ফরমান: যারা নিজেদের (আত্মার) প্রতি যুলূম করেছিল, তাদের বসতিতে অশ্রুসিক্ত (ও বেদনার্ত) অবস্থা ছাড়া প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের প্রতিও অনুরূপ শাস্তি এসে পড়ে। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩২০০-৩২০১; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৫-২২৮৬ #২৯৮০; আহমদ ইবানে হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৯৬; ইবনে হিব্বান কৃত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৮০ #৬১৯৯; এবং আল-রূইয়্যা’নী রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৪০৭ #১৪০৯]
এই হতভাগ্য সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বিশ্বনবী (দ:)-এর নির্দেশ ছিল এ মর্মে যে, দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে ও অশ্রুসিক্ত নয়নে  তাদের ধ্বংসাবশেষ অতিক্রম করতে হবে। সর্বাধিক করুণাময় রাসূল (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দের (রা:) মাধ্যমে এই উম্মতকে এটা  শিক্ষা দিয়েছেন যেন আমরা যখন বিলীন জাতিগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর কথা স্মরণ করবো, তখন আল্লাহর প্রতি এমন বিনয় প্রকাশ করবো যাতে ওই জাতিগোষ্ঠী যেভাবে খোদায়ী শাস্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল সেভাবে আমরাও আক্রান্ত না হই। যদিও দৃশতঃ (সাহাবা-মণ্ডলীর মাঝে) মহানবী (দ:)-এর সম্মানিত উপস্থিতি এধরনের (আযাবের) ঘটনা রহিত করার অসীলাস্বরূপ, তবু তাঁদেরকেও দুঃখ-বেদনাময় ভাবাপ্লুত হতে বলা হয়েছে। এই হাদীস হতে আমরা এ শিক্ষা-ই পেয়েছি।
এই বিষয়টি অন্তর ও আত্মার অনুভূতি ও আবেগের সাথে সম্পৃক্ত। ইমাম মুসলিম (রহ:) ওপরে বর্ণিত এ হাদীসটি তাঁর ‘আল-সহীহ’ গ্রন্থের ‘কিতাব আল-রাক্বা’য়েক্ব’ (আত্ম-অস্বীকৃতি ও অন্তর কোমলকরণ) শীর্ষক বইয়ে উদ্ধৃত করেন। ইমাম সাহেব (রহ:) চেয়েছেন এই বার্তা পৌঁছে দিতে যে বিষয়টি ওইসব আমল (পুণ্যদায়ক কাজ) ও অনুশীলনের সাথে সম্পর্কিত, যেগুলো কারো অন্তর ও আত্মার ওপর আধ্যাত্মিক প্রভাব ফেলে। এধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে কারো অন্তস্তলে বিশেষ এক অনুভূতি বা আবেগ সৃষ্টি হয়, যার ফলে সে আধ্যাত্মিক পর্যায়ে তার জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসে। কারো আত্মার মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক উপকার যদি এতে নিহিত না থাকতো, তাহলে সর্বাধিক দয়াশীল রাসূলুল্লাহ (দ:) কেন তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রা:)-কে পুনরায় ওই অভিজ্ঞতা পেতে নির্দেশনা দানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন? তাঁদের আত্মিক হাল তথা অবস্থার পরিশুদ্ধি বা উন্নতিতে প্রভাব ফেলে না এমন কোনো কাজ করতে তো তিনি তাঁদেরকে আদেশ দিতে পারতেন না। তিনি তাঁদেরকে এটা করতে নির্দেশ দেয়ার বাস্তবতা-ই প্রমাণ করে যে এসব অবস্থা ব্যতিক্রমহীনভাবে প্রভাব ফেলে থাকে।
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: এসব (খোদায়ী) শাস্তিপ্রাপ্ত লোকদের বসতিতে অশ্রুসিক্ত অবস্থা ছাড়া প্রবেশ করো না। অশ্রুসজল না হতে পারলে তাতে প্রবেশ করো না, যাতে অনুরূপ অভিসম্পাত তোমাদের ওপর এসে না পড়ে। [আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাসা’জিদ’, ‘শাস্তির এলাকায় নামায’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:১৬৭ #৪২৩; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাগা’যী’, ‘আল-হিজর এলাকায় মহানবী (দ:)-এর শিবির স্থাপন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬০৯ #৪১৫৮; মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৫ #২৯৮০; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৫১; এবং আবদ বিন হুমায়দ লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৫৫ #৭৯৮]
প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সামূদ গোত্রের লোকদের বসতভিটায় প্রবেশ করতে এমনভাবে মানা করেন যেন তারা এখনো সেখানে জীবিতাবস্থায় আছে। এটা এ কারণে যে, (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) মাদী উটকে হত্যা করার অপরাধে আল্লাহতা’লা তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করেন। যদিও এ ঘটনা দীর্ঘকাল আগে ঘটেছিল, তবুও সর্বাধিক দয়াবান রাসূল (দ:)-ই এখানে খোদায়ী প্রতিবিধানের কথা স্মরণ করানোর জন্যে এবং প্রত্যেকের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয় সৃষ্টির লক্ষ্যে নির্দেশ প্রদান করেছেন।
মহাসম্মানিত নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর পুণ্যবান সাহাবা (রা:)-মণ্ডলীকে আদেশ করেন যেন তাঁদের চোখের সামনে আল্লাহর শাস্তি ভেসে ওঠে, যাতে ওই ধ্বংসাবশেষ অতিক্রমকালে তাঁদের অন্তরে আল্লাহর শাস্তি পতিত হওয়ার ভীতির দরুন তাঁদের কান্না আসে। আর এটা তাঁরা না করতে পারলে তাঁদেরকে ওই উপত্যকায় প্রবেশ করতেই বারণ করা হয়। কতিপয় সাহাবা (রা:) হুযূর পূর নূর (দ:)-এর কাছে আরয করেন এই মর্মে যে তাঁরা যদি বেদনায় অশ্রুসজল না হতে পারেন, তাহলে তাঁরা কী করবেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) সাহাবামণ্ডলী (রা:)-এর এই আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী (দ:)-এর উত্তর বর্ণনা করেন এভাবে: তোমরা কাঁদতে না পারলে কান্নাকাটি করার চেষ্টা করো এ আশঙ্কায় যে তাদের প্রতি পতিত শাস্তি তোমাদের প্রতিও পতিত হতে পারে। [ইবনে কাসীর রচিত ‘আল-বেদা’য়া ওয়াল-নেহা’য়া’, ১:১৩৮; ইবনে কাসীর কৃত ’আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম’, ২:৫৫৭; এবং আল-আসক্বালা’নী প্রণীত ‘ফাতহুল বা’রী’, ৬:৩৮০]
কান্নাকাটি করা শ্রেয়তর; কিন্তু কেউ তা না পারলে তার উচিত যে ব্যক্তি এটা পেরেছে, তাকে অনুকরণ করা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহতা’লার শাস্তির কথা চিন্তা করে মানুষ যেন খোদাভীরুতা অর্জন করে, এবং এরই ফলে মহান প্রভুর প্রতি বিনয়ী হয় এবং তাঁরই আশ্রয় প্রার্থনা করে। এই ঘটনা বহুকাল আগে ঘটেছিল এবং এর মুহূর্তগুলোও অতিবাহিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও প্রিয়নবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে সাথে নিয়ে এই ঘটনার স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে একে জীবন্ত করে রেখেছেন।
২.৪.৫ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নিজস্ব আমল
সামূদ গোত্রের বসতি অতিক্রমকালে সৃষ্টিকুল শিরোমণি মহানবী (দ:) আপন চলার গতি বাড়িয়ে দেন, আর আপন চাদর দ্বারা নিজেকে আচ্ছাদিত করেন এমনভাবে যেন (খোদায়ী) শাস্তি বুঝি ওই সময়েও পতিত হচ্ছিল।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর সওয়ারের জন্তুর ওপর বসা অবস্থাতেই আপন চাদর দ্বারা নিজেকে আবৃত করেন। [আল-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩২০০; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৬৬; আল-নাসাঈ রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৬:৩৭৩ #১১,২৭০; এবং ইবনে মুবারক লিখিত ‘আল-যুহদ’, পৃষ্ঠা নং ৫৪৩ #১৫৫৬]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) আরো বর্ণনা করেন: মহানবী (দ:) আল-হিজর অতিক্রম করার সময় বলেন, “যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে, তাদের বসতিতে তোমরা প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের ওপরও ওই শাস্তি পতিত হয়। বরঞ্চ তোমরা তাদেরকে অতিক্রম করো কান্নারত অবস্থায়।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর শির মোবারক ঢেকে দ্রুতবেগে সেই স্থান পার হয়ে যান। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাগা’যী’, ‘আল-হিজরে মহানবী (দ:)-এর সেনাশিবির’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬০৯ #৪১৫৭; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৬ #২৯৮০; আবদুর রাযযাক্ব প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ১:৪১৫ #১৬২৪; এবং আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৫১]
প্রিয়নবী (দ:) কর্তৃক উক্ত উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম করার সময় নিজ শির মোবারককে ঢেকে রাখা এবং এর পাশাপাশি তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে কান্নারত অবস্থায় এলাকাটি পার হতে বলাটা এমন এক আমল, যা’তে নিহিত  রয়েছে আমাদের জন্যে গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।
২.৪.৫.১ বিবেচনাযোগ্য বিষয়াবলী  
এসব হাদীসের আলোকে নিম্নের সিদ্ধান্তগুলো নেয়া যায়:
প্রথমতঃ আমাদের মনে রাখতে হবে যে সর্বসেরা আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবান নবী করীম (দ:)-এর উপস্থিতি-ই আল্লাহতা’লার করুণার এক উৎস এবং তাঁর গযব (রোষ/অসন্তুষ্টি) ও আযাব (শাস্তি) নিরোধক। অতএব, প্রিয়নবী (দ:) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মাঝে স্বশরীরে উপস্থিত থাকা অবস্থায় শাস্তি পতিত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না। উপরন্তু, ওই সেনা অভিযানে শরীক হয়েছিলেন হুযূর পাক (দ:)-এর পুণ্যবান সাহাবীবৃন্দ (রা:), যাঁদের মধ্যে একজনও বে-ঈমান ছিলেন না, আল্লাহ মাফ করুন। ইতিহাসজুড়ে এর চেয়ে শ্রেয়তর সঙ্গি-সাথী পৃথিবীর বুকে আর কেউই ছিলেন না। এরকম মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি আল্লাহতা’লা শাস্তির বিধান করবেন, এ কথা কি চিন্তাও করা যায়?
ওই সময় সামূদ গোত্রের লোকেরা, যারা মাদী উটের পেশীতন্তু কেটে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেছিল, তারা আর জীবিত ছিল না। এতদসত্ত্বেও সবচেয়ে দয়াবান মহানবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে এ মর্মে উপদেশ দেন যেন তাঁরা শাস্তি পতিত হওয়ার ঘটনাটি কল্পনা করেন এবং তাঁদের অন্তর ও মস্তিষ্কে এর ভয় ও আশঙ্কার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। এর ফলে প্রত্যেক সাহাবী (রা:)-ই প্রচুর কান্নাকাটি করেন এবং এই বিবেকের দংশন অনুভব করেন যে শাস্তি প্রকৃতপক্ষে তৎক্ষণাৎ পতিত হতে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়তঃ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সেনা অভিযানে মহান সাহাবী (রা:)-বৃন্দ একা ছিলেন না, তাঁদের সাথে উপস্থিত ছিলেন সৃষ্টিকুল শিরোমণি, মহাসম্মানিত পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং আল্লাহর কাজ এ নয় যে তাদেরকে শাস্তি দেবেন যতোক্ষণ পর্যন্ত হে মাহবূব, আপনি তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন।” [আল-ক্বুরআ’ন, ৮:৩৩; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন সাহেব কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]
খোশ-খবরীর (মানে ঐশী সুসংবাদের) ব্যাপারে ওয়াকেফহাল থাকা সত্ত্বেও পুণ্যবান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) ‘সামূদ’ গোত্রের (করুণ) পরিণতি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন এবং আল্লাহ-ভীতির (তাক্বওয়ার) কারণে তাঁর প্রতি সমর্পিত হন। এটা অনুশীলন করে তাঁরা বাস্তবায়ন করেন প্রিয়নবী (দ:)-এর শিক্ষাসমূহ এবং পূরণ করেন দ্বীন-ইসলামের একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, যথা – (ঐশীদানের) আনন্দঘন মুহূর্তে খুশি ও দুঃখ-বেদনার সময় শোক প্রকাশ। অন্তর ও মস্তিষ্কে মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রত্যেকের উচিত ঘটনা হতে প্রত্যাশিত আবেগগুলোর রোমন্থন করা। কারো অন্তরে এ ধরনের আবেগ ও অনুভূতি গড়ে তোলার জন্যে একটি জায়গা বানিয়ে রাখা হয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো কিছু স্বাভাবিকভাবে অনুভব করা আর কোনো কিছুর জন্যে অনুভূতি সৃষ্টি করার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিরাজমান। কোনো ব্যক্তির যখন বিশ্বাস অটল-অবিচল এবং তার চেনাজানার সম্পর্ক-ও সুদৃঢ়, তখন তার আবেগ বৃদ্ধি পায় প্রেরণার ভিত্তিতে। কেউ এটা অর্জন করতে পারেন শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি নিজের গোলামির প্রকৃত মর্ম উপলব্ধির মাধ্যমেই। কোনো দুঃখ-বেদনার ঘটনায় শোকের কারণে কারো অশ্রু প্রয়াসহীনভাবে গড়িয়ে পড়ে; আর খুশির ঘটনার মুহূর্তে উৎফুল্লচিত্তের কারণে কেউ স্বাভাবিকভাবেই স্মিতহাস্য করেন। এ উপায়ে অতীত ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ করাটা মহানবী (দ:)-এর উদ্দেশ্যের সাথে একদম সঙ্গতিপূর্ণ, আর এ বিষয়টি হাদীসগুলো হতে সপ্রমাণিত।
সবশেষে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হলো, পরম দয়াবান মহানবী (দ:) শুধু তাঁর মহান সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে কান্নারত অবস্থায় উপত্যকাটি অতিক্রম করতে বলেই ক্ষান্ত হননি, বরঞ্চ তিনি নিজেও তা অতিক্রমের সময় কাপড় দ্বারা আপন শির মোবারককে আবৃত করেছিলেন এবং তাঁর সওয়ারকৃত উট দ্রুতবেগে ছুটিয়েছিলেন। এটা (দেখে) কারো কাছে এমন মনে হতে পারতো যে রাসূলুল্লাহ (দ:) ধ্বংসের মুখোমুখি (সামূদের) এসব লোকজন হতে বহু দূরে সরে যেতে চাইছিলেন।
প্রিয়নবী (দ:) এ রকম (আচরণ) করার কী প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন, যদিও বাস্তবতা ছিল এ ঘটনা বহু হাজার বছর আগে ঘটেছিল? আল্লাহর দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ মর্যাদাবান পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মাক্বাম এমন-ই যে তিনি যেখানে যেতেন, সেখানেই রহমত (আশীর্বাদ) নাযেল হতো, আর শাস্তি নিবারণ হতো। মহানবী (দ:) স্বয়ং হচ্ছেন (খোদায়ী) করুণার পরমোৎকর্ষের মূর্ত রূপ এবং মানবজাতির সুপারিশকারী ত্রাতা। যাঁর খাতিরে আল্লাহতা’লা নিজের আরোপিত শাস্তি ফিরিয়ে নেন, তিনি কীভাবে ওই শাস্তির ভয়ে মুহ্যমান থাকবেন? এ ধরনের চিন্তা করাটাও অসম্ভব, এমন কি সবচেয়ে দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তিও এভাবে চিন্তা করবেন না। অতএব, হুযূর পূর নূর (দ:) যদি ওই হালত তথা (মানসিক) অবস্থায় উপত্যকাটি ছেড়ে যান, তাহলে স্রেফ উম্মতকে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যেই তিনি তা করেছিলেন।
২.৫ হস্তীবাহিনীর লোকদের প্রতি অবতীর্ণ শাস্তির স্মরণ এবং মুহাসসির উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম
মুহাসসির উপত্যকা কোথায় অবস্থিত, এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি মত হলো, স্থানটি মুযদালিফা’র কাছে [এয়া’ক্বূত আল-হামাভী কৃত ‘মু’জাম আল-বুলদা’ন’, ১:৪৪৯]। ফযল ইবনে আব্বা’স (রহ:)-এর ভাষ্য মোতাবেক আরেকটি মত হলো তা মিনা’য় অবস্থিত [মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘হাজ্বীর পাঠকৃত তালবিয়্যার সময়কাল’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৩১ #১২৮২; আল-নাসা’ঈ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক আল-হাজ্জ্ব’, ‘আরাফা হতে সফরের সময় শান্ত থাকার নির্দেশ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২৮৫ #৩০২০; আল-নাসা’ঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৩৪ #৪০৫৬; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২১০ #১৭৯৬; এবং আল-বায়হাক্বী রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১২৭ #৯৩১৬]। শায়খ আবদুল হক্ব মোহাদ্দিসে দেহেলভী (রহ:) এই দুটো মতের মধ্যে সমন্বয় করে বলেন যে মুহাসসির উপত্যকা প্রকৃতপক্ষে মিনা’ ও মুযদালিফা’র মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত [শায়খ আবদুল হক্ব দেহেলভী প্রণীত ‘আশয়াত আল-লুম’আ’ত শরহে মিশকা’ত আল-মাসা’বিহ’, ২:৩৪৫]। মুযদালিফা’র আশপাশ এলাকাটিতে হাজ্বী সাহেবান অবস্থান করলেও মুহাসসির উপত্যকাটি ওই এলাকার বাইরে হওয়ায় সেখানে অবস্থান করতে তাঁদেরকে নিষেধ করা হয়েছে [আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৮২ #১৬,৭৯৭; ইবনে হিব্বা’ন রচিত ‘আল-সহীহ’, ৯:১৬৬ #৩৮৫৪; আল-শায়বা’নী প্রণীত ‘’কিতা’ব আল-মাবসূত’, ২:৪২২; ইবনে আবী শায়বা লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৩:২৪৬ #১৩৮৮৪-১৩৮৮৫; আল-দায়লামী রচিত ‘আল-ফেরদৌস বি-মা’সূর আল-খিতা’ব’, ৩:৪৪ #৪১১৩; আল-বায়হাক্বী কৃত ’আল-সুনান আল-কুবরা’, ৯:২৯৫ #১৯,০২১; আল-তাবারা’নী প্রণীত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ২:১৩৮ #১৫৮৩; আল-হায়সামী লিখিত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৩:২৫১; এবং আল-হায়সামী কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৪:২৫]।
যিলহজ্জ্ব মাসের ১০ তারিখ সূর্যোদয়ের প্রাক মুহূর্তে (ফজরের দুই রাক’আত নামায পড়ার সময়ে) হাজ্বী সাহেবান তালবিয়্যা পাঠ করতে করতে মিনা’র উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করেন; আর যখন তাঁরা মুহাসসির উপত্যকায় পৌঁছেন, তখন তাঁদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাঁচতে তাঁরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে দ্রুতবেগে সে স্থান অতিক্রম করতে হয়। [ওয়াহবা আল-যুহায়লী রচিত ‘আল-ফিকহু আল-ইসলা’মী ওয়া আদিল্লাতুহু’, ৩:২১৬৮]
কেন এটা এরকম? এ কারণে যে, প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের আগে বাদশাহ আবরাহা এক হস্তীবাহিনীসহ কা’বা শরীফ ধ্বংস করার ইচ্ছা করেছিল। তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে সে মুহাসসির উপত্যকায় পৌঁছুলে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার গযব (রোষ) তার ওপর অবতীর্ণ হয়। এক ঝাঁক (আবাবীল) পাখি ওপর থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে তাকে এবং তার হস্তীবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় [ইবনে হিশা’ম প্রণীত ‘অাল-সীরা আল-নাবাউইয়্যা’, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৭; ইবনে আসীর কৃত ‘আল-কা’মিল ফী আল-তা’রীখ’, ১:৪৪২-৪৪৭; আল-সুহায়লী রচিত ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল-সীরা আল-নাবাউইয়্যা লি-ইবনে হিশা’ম’, ১:১১৭-১২৬; ইবনে আল-ওয়ার্দী লিখিত ‘তাতিম্মা আল-মুখতাসার ফী আখবা’র আল-বাশর’, ১:৯২; ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-বেদা’য়া ওয়া আল-নেহা’য়া’, ২:১০১-১১০; আল-কসতলা’নী কৃত ‘আল-মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়্যা’, ১:৯৯-১০৪; আল-সা’লেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়া আল-রাশা’দ ফী সীরা খায়র আল-এবা’দ’, ১:২১৭-২২২; এবং আল-যুরক্বা’নী লিখিত ‘শরহু আল-মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়্যা’, ১:১৫৬-১৬৬]। এই ঘটনাটি কুরআনে করীমের সূরা ফীল, অর্থাৎ, হস্তী অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে এভাবে:
হে মাহবূব! আপনি কি দেখেননি আপনার রব্ব ওই হস্তী আরোহী বাহিনীর কী অবস্থা করেছেন? তাদের চক্রান্তগুলোকে কি তিনি ধ্বংসের মুখে ছুঁড়ে ফেলেননি? এবং তাদের ওপর পাখির ঝাঁকগুলোকে প্রেরণ করেছেন; যেগুলো তাদেরকে কঙ্কর-পাথর দিয়ে হনন করছিল। অতঃপর (তিনি) তাদেরকে চর্বিত ক্ষেতের পল্লবের মতো করেছেন। [আল-ক্বুরআ’ন, ১০৫:১-৫]
এ কারণেই হজ্জ্ব পালনকালে মহানবী (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে মুহাসসির উপত্যকাটি তাড়াতাড়ি পার হয়ে যেতে আদেশ করেন। তাঁদের আচরণ ছিল শঙ্কার, যেন এই বুঝি শাস্তি এসে পড়বে; যে শাস্তি প্রকৃতপক্ষে বহু বছর আগেই আবরাহা ও তার হস্তীবাহিনীর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয়নবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে তাঁদের নিজেদের মধ্যে আল্লাহভীতির এক অনুভূতি/হাল জাগিয়ে তুলতে বলেন। তিনি নিজেও একই কাজ করেন, আর উপত্যকাটি ত্বরিত অতিক্রম করেন।
মুহাসসির উপত্যকা পার হওয়ার সময় হুযূর পাক (দ:)-এর হাল/অবস্থা হযরত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ) বর্ণনা করেন এভাবে: তিনি মুহাসসির উপত্যকা পর্যন্ত গমন করলে তাঁর উটের লাগাম আপন পবিত্র হাতে নেন, আর উটটি দ্রুত উপত্যকা পার হয়ে যায়। অতঃপর তিনি থামেন। [আল-তিরমিযী প্রণীত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘গোটা আরাফা দাঁড়াবার জায়গা মর্মে যাবতীয় বর্ণনা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২৩২ #৮৮৫; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৭৫ #৫৬২; ইবনে খুযাইমা রচিত ‘আল-সহীহ’, ৪:২৭২ #২৮৬১; আল-বাযযার লিখিত ‘আল-বাহর আল-যুখা’র’, ২:১৬৫ #৫৩২; এবং আবূ এয়া’লা’ প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৬৪ #৩১২]
শায়খ আবদুল হক্ক মোহাদ্দেসে দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) লেখেন: পদব্রজে হোক, বা সওয়ারে চড়ে হোক, এই উপত্যকাটি দ্রুত পার হওয়া মুস্তাহাব (প্রশংসনীয় আমল)। [আবদুল হক্ক দেহেলভী রচিত ‘আশ’আত আল-লোম’আত শরহে মিশকা’ত আল-মাসা’বীহ’, ২:৩২৪]    
মহানবী (দ:) কেন তাঁর সাহাবাবৃন্দকে (রা:) উপত্যকাটি দ্রুতবেগে অতিক্রম করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন? এখন তো আর (আবাবীল) পাখির ঝাঁক বা কঙ্করবৃষ্টির অস্তিত্ব-ই নেই। এর উত্তর হচ্ছে এটা এমনই এক আমল (অনুশীলন), যা থেকে আমরা উপদেশ ও সতর্কবাণী এবং নিজেদের আধ্যাত্মিক অবস্থার উন্নতিসাধন সংক্রান্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। উপত্যকাটিতে তাড়াতাড়ি পার হওয়ার এই ব্যাপারটি শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত অনুশীলনীয় একটি সুন্নাহ’তে পরিণত হয়েছে, আর হাজ্বীদেরকে এই স্থানটি ত্বরিত অতিক্রমের হুকুম দেয়া হয়েছে।
এর পেছনে একটি উদ্দেশ্যই নিহিত আর তা হলো, অতীত ঘটনাবলী প্রত্যেকের অন্তরে স্মরণীয় হয়ে থাকা এবং মস্তিষ্কে সেগুলোকে দৃঢ়ভাবে গেঁথে রাখা। ওপরোক্ত হাদীসগুলো এর সত্যতা প্রতিপাদন করে; এধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা দ্বীন-ইসলামের শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   
২.৬ হযরত উমর ফারূক (রা:) কর্তৃক ব্যক্ত অনুতাপ
কারো দ্বারা স্মৃতিরোমন্থনে আনন্দ-বেদনার আবেগ-অনুভূতি লাভ করা একেবারেই স্বাভাবিক; তাদের চেহারাতেই ওই অভিব্যক্তি দৃশ্যমান হয়। কোনো আনন্দঘন মুহূর্ত দেখা দিলে মানুষের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে; কিন্তু দুঃখবেদনায় চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে। এই সূত্রে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:)-এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে: হযরত আবদুর রাহমান বিন আবী লায়লা (রা:) বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা:) ফজরের নামাযে আমাদের ইমাম হন। তিনি সূরা ইউসুফ তেলাওয়াত করছিলেন যখন নিম্নের আয়াতে পৌঁছেন – “আর তাঁর নয়নযুগল শোক-সন্তাপে শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল, কিন্তু তিনি তাঁর দুঃখ চেপে রেখেছিলেন।” এ সময় হযরত উমর (রা:) কাঁদতে থাকেন অঝোর ধারায়। এরপর তিনি রুকু (দাঁড়িয়ে নত) অবস্থায় গমন করেন। [আল-শায়বানী লিখিত ‘কিতা’ব আল-হুজ্জা ‘আলা’ আহল আল-মাদীনা’, ১:১১৩ ও ১১৫-১১৬; এবং আল-তাহা’বী প্রণীত ‘শারহ মা’আনী আল-আসা’র’: কিতা’ব আল-সালা’ত’, ‘ফজর ওয়াক্তের সময়’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:২৩৩ #১০৫১]
ইবনে আবযী বলেন, আমি হযরত উমর (রা:)-এর ইমামতিতে নামায পড়ছিলাম। তিনি সূরা ইউসুফ তেলাওয়াত করছিলেন যখন নিম্নের আয়াতে উপনীত হন – “আর তাঁর নয়নযুগল শোক-সন্তাপে শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল, কিন্তু তিনি তাঁর দুঃখ চেপে রেখেছিলেন।” এমতাবস্থায় হযরত উমর (রা:) কান্নায় আপ্লুত হয়ে পড়েন; অতঃপর তিনি রুকূতে যান। [ইবনে ক্বুদা’মা রচিত ‘আল-মুগ্বনী’, ১:৩৩৫]
এই হাদীসগুলোতে আমরা দেখতে পাই যে হযরত উমর (রা:) পয়গম্বর এয়াক্বূব (আ:)-এর কষ্টে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আহাদীসে এবং ক্বুরআন মজীদের তাফসীরগুলোতে এমন অসংখ্য নজির আছে, যা প্রমাণ করে যে ঈমানদারীর নির্যাস মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে নিহিত – এই হালত বা আত্মিক/আধ্যাত্মিক অবস্থার ধারণ প্রত্যেক ঈমানদারকে এর মিষ্টস্বাদের আশীর্বাদ এনে দেয়। এমন কি মহানবী (দ:)-এর প্রতি ঈমান আনাও মূলতঃ কোনো ঈমানদারের অন্তরসংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য; হুযূর পাক (দ:)-এর আনুগত্য ও অনুসরণ-ও তাঁরই প্রতি ঈমানদারের অন্তরের মহব্বত হতে সৃষ্ট। তাঁর আশীর্বাদধন্য বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন)-কে আল-ক্বুরআনে মানবজাতির জন্যে আল্লাহতা’লার সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত (করুণা) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪]। এই রহমতের প্রতি কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়? রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর এই শুভাগমনকে তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা কীভাবে দেয়া যায়? প্রিয়নবী (দ:)-এর জন্যে ঈমানদারের পরম এশক্ব-মহব্বত কীভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে একটি (সিদ্ধান্তের) দিকেই নিয়ে যায়, আর তা হচ্ছে মওলিদুন্নবী (দ:) উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা। এই শুভক্ষণে আমরা সভা-সমাবেশের আয়োজন করি এবং হুযূর পূর নূর (দ:)-এর ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হই; আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ-ই তাঁর আনুগত্যে আমরা নিয়ে থাকি।
এই আলোচনার সারমর্ম হলো, অতীত ঘটনাবলীর প্রতি আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশ এবং নিজের মধ্যে ওই অবস্থা সৃষ্টি করা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সুন্নাহ’রই আওতায় পড়ে। যদিও মহানবী (দ:)-এর বেলাদত শরীফের পরে চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, তবুও ধরাধামে তাঁর আশীর্বাদধন্য শুভাগমনকে স্মরণ করে আমরা আমাদের খুশি প্রকাশ করে থাকি। মওলিদুন্নবী (দ) পালনের ক্ষেত্রে যে কারণে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি তা হলো, নবী করীম (দ:) স্বয়ং অতীতে সংঘটিত ঘটনাবলীর ব্যাপারে তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সেগুলো স্মরণ করতে আদেশ দিয়েছিলেন এবং ওইসব ঘটনার অভিজ্ঞতা নিজেদের (অন্তরের) মধ্যে পুনরায় জীবন্ত করে তুলতে বলেছিলেন। তাই এটা মহানবী (দ:) ও তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (দ:)-এর সুন্নাহ বটে।
এই ধূলির ধরায় মহানবী (দ:)-এর শুভাগমন আল্লাহতা’লার সর্বসেরা রহমত তথা করুণা; এ এক মহা অনুগ্রহ ও ঐশীদান। এই উম্মতের জন্যে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লগ্ন। মা আমেনা (রা:) যে আনন্দ ও আবেগের কম্পনভাব অনুভব করেছিলেন, প্রত্যেক মুসলমান-ব্যক্তিকেও অনুরূপ খুশি ও উৎফুল্লচিত্ত হওয়া চাই। মহাসম্মানিত পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মত হিসেবে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপনের মাধ্যমে এই চৌদ্দশ বছরের (ঐতিহ্যবাহী) ঘটনার স্মৃতি অন্তরে জাগুরূক রাখা আমাদের জন্যে তাই অবশ্যকর্তব্য হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়
আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের স্মরণ: একটি কুরআনী বিশ্লেষণ
ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন নিদর্শন বা চিহ্ন, যেগুলো মুসলিম উম্মাহ’র (মানে সমাজের) প্রতি এবাদত-বন্দেগীর আকারে বাধ্যতামূলক হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা একখানা বিশ্লেষণ পেশ করেছি। যদি আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের জীবন এবাদতের মাধ্যমে স্মরণ করা যায়, তাহলে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য শুভাগমনকে কেন উদযাপনের মাধ্যমে স্মরণ করা যাবে না? কুরআন মজীদের গভীর অধ্যয়ন দ্বারা প্রতীয়মান হবে যে আল্লাহতা’লার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন)-কে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বর্ণনা দেয়া একটি ঐশী প্রথা। এই অধ্যায়ে আমরা আলোকপাত করবো আল-কুরআন কীভাবে পয়গম্বর (আলাইহিমুস সালাম)-বৃন্দের বেলাদতের কথা উল্লেখ করেছে।
৩.১ মওলূদের পটভূমি
আরবদের মাঝে ইমামবৃন্দ ও হাদীসশাস্ত্রবিদমণ্ডলী রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত-বিষয়ে অনেক বইপত্র লিখেছেন। তাঁদের প্রচলিত ভাষায় এধরনের সাহিত্য ‘মওলিদ’, ‘মাওয়া’লীদ’ বা ‘মওলূদ’ হিসেবে বহুল পরিচিত। আরব বিশ্বে রবিউল আঊয়াল মাসে সর্বত্র প্রসারলাভকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানবৃন্দের একটি ঐতিহ্য বিদ্যমান, যা’তে মওলিদ পাঠের জন্যে তাঁরা সভা-সমাবেশের আয়োজন করেন এবং মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতকে ঘিরে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উল্লেখ-ও করেন। ইমামমণ্ডলী ও হাদীসবেত্তাবৃন্দের লেখা মওলূদ শরীফ মদীনা মোনাওয়ারা, মক্কা মোয়াযযমা, সিরিয়া, মিসর, ইরাক, ওমান, জর্দান , আরব আমিরাত, কুয়েত, লিবিয়া ও মরক্কো ছাড়াও পৃথিবীর সবদেশে পাঠ করা হয়। উর্দূভাষীদের মাঝে এটা ’মীলা’দ-না’মা’ হিসেবে পরিচিত।
৩.২ আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের স্মরণ: এক ঐশী-প্রথার চর্চা  
কতিপয় ’আধুনিকতাবাদী’ এ মর্মে ধারণা লালন করেন যে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত এখন অতীত একটি ঘটনা, তাই এর উদযাপনের কী প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? তাদের দৃষ্টিতে হুযূর পাক (দ:)-এর জীবন ও সুন্দর আচার-আচরণকেই স্মরণ করা উচিত। বস্তুতঃ এধরনের মানসিকতা আল-কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শনের সম্পূর্ণ খেলাফ। তাই এই বিভ্রান্তি যাতে দূর হয়ে যায়, সেজন্যে এ বিষয়টির সমাধান জরুরি।
আল-কুরআন ও হাদীস শরীফের (সূক্ষ্ম) বিশ্লেষণ আমাদেরকে জ্ঞাত করে যে আল্লাহতা’লার প্রিয় ও মনোনীত বান্দাদেরকে স্মরণ করা কেবল এবাদত-ই নয়, বরং এটা স্বয়ং আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ তথা অনুশীলিত রীতি। কুরআন মজীদে মহান প্রভু তাঁর বিশেষ ও পছন্দকৃত বান্দাদের কথা উল্লেখ করেন এবং বহুবার মহানবী (দ:) তা তেলাওয়াত করেন। অতএব, এই দলিলের ভিত্তিতে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত স্মৃতিচারণ আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর অনুশীলিত রীতির আওতায় পড়ে।
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিবরণ উল্লেখ করা এতোই বড় নেয়ামতের উৎস যে, এর বাস্তবতা আমাদের সবার চোখের সামনে প্রকাশ্যে উপস্থিত। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে পয়গম্বরবৃন্দ (আ:) ও তাঁদের উম্মতের কাহিনী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় পয়গম্বরবৃন্দ (আ:) ও সৎকর্মশীলদের (মানে আউলিয়া কেরামের) স্মরণকে আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য করার দৃষ্টান্ত-ও পবিত্রগ্রন্থে বিরল নয়।
১. আল্লাহতা’লা সূরা আল-আনআমে পয়গম্বরমণ্ডলী (আ:)-এর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে এরশাদ ফরমান: “আর ইসমাঈল, ইয়াসা’, ইয়ূনুস এবং লূতকেও; আর আমি প্রত্যেককে তাঁরই যুগের সবার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। এবং তাদের পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের মধ্য থেকে কতেককেও; এবং আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি ও সোজা পথ দেখিয়েছি।” [আল-ক্বুরআন, ৬:৮৬-৮৭, তাফসীরে নূরুল এরফান]
২. কুরআন মজীদের ১৪তম অধ্যায়টির (সূরার) শিরোনাম আল্লাহতা’লার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-নামে করা হয়েছে। এই সূরায় তাঁর দুই ছেলে সর্ব-পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) ও ইসহাক্ব (আ:)-কে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাক্বকে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব্ব প্রার্থনা শ্রবণকারী।” [আল-ক্বুরআন, ১৪:৩৯, প্রাগুক্ত নূরুল এরফান]
৩. সূরা মরিয়ম আল্লাহর আশীর্বাদধন্য বান্দাদের বিবরণ দ্বারা পরিপূর্ণ; এতে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের স্মরণে কোনো ছেদ-ই পড়েনি। এই সূরা আল্লাহতা’লা আরম্ভ করেন পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর দোয়া দ্বারা: “এটা হচ্ছে বিবরণ তোমার রব্বের ওই অনুগ্রহের, যা তিনি আপন বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি করেছেন, যখন সে আপন রব্বকে নীরবে আহ্বান করেছিল।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:২-৩]
৪. আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং আমার কাছ থেকে দয়া ও পবিত্রতা; এবং (সে) পরিপূর্ণ খোদা-ভীতিসম্পন্ন ছিল।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:১৩]
৫. আল্লাহতা’লা ঘোষণা করেন: “এবং কিতাবে মরিয়মকে স্মরণ করুন! যখন আপন পরিবারবর্গ থেকে পূর্বদিকে পৃথক একস্থানে চলে গিয়েছিল।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:১৬]
৬. আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং কিতাবে ইব্রাহীমকে স্মরণ করুন! নিশ্চয় সে ছিল অতীব সত্যবাদী, অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)।” [আল-কুরআন, ১৯:৪১]
৭. আল্লাহতা’লা বলেন: “এবং কিতাবের মধ্যে মূসা’কে স্মরণ করুন! নিশ্চয় সে মনোনীত ছিল এবং রাসূল ছিল, অদৃশ্যের সংবাদসমূহ বর্ণনাকারী।” [আল-কুরআন, ১৯:৫১]
৮. আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং কিতাবের মধ্যে ইসমাঈলকে স্মরণ করুন! নিশ্চয় সে প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী ছিল এবং রাসূল ছিল, অদৃশ্যের সংবাদসমূহ বহনকারী; এবং আপন পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতো; আর আপন রব্বের কাছে পছন্দনীয় ছিল।” [আল-কুরআন, ১৯:৫৪-৫৫]
৯. আল্লাহতা’লা ঘোষণা করেন: “এবং কিতাবের মধ্যে ইদরীসকে স্মরণ করুন! নিঃসন্দেহে সে অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠ ছিল, অদেৃশ্যের সংবাদসমূহ বর্ণনাকারী। এবং আমি তাকে উচ্চ স্থানের ওপর উঠিয়ে নিয়েছি।” [আল-কুরআন, ১৯:৫৬-৫৭]
১০. অনুরূপভাবে, সূরা আম্বিয়া-ও পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর বিবরণ দ্বারা পরিপূর্ণ। পঞ্চাশ ও তৎপরবর্তী আয়াতগুলোতে হ্রাস না পাওয়া বিবরণ রয়েছে, যার শুরু হয়েছে নিম্নের কথা দ্বারা: “এবং এটা (ক্বুরআন) হচ্ছে কল্যাণময় উপদেশ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি। তবুও কি তোমরা সেটার অস্বীকারকারী হও?” [আল-ক্বুরঅান, ২১:৫০]
১১. ‘সবচেয়ে বরকতময় যিকর (স্মরণ)’ শিরোনামে নিম্নের আয়াতটি পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের পিতা হয়রত ইবরাহীম (আ:)-এর কথা উল্লেখ করেছে এভাবে: “আর নিশ্চয় আমি ইব্রাহীমকে পূর্ব থেকেই তার সৎপথ দান করেছি এবং আমি তার সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত ছিলাম।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৫১, প্রাগুক্ত নূরুল এরফান]
১২. বিস্তারিত একটি বিবরণের পরে সর্ব-পয়গম্বর লূত (আ:), ইসহাক্ব (আ:) ও এয়া’ক্বূব (আ:)-এর কথাও স্মরণ করা হয়েছে এতে। এর শেষ হয়েছে এই বলে: “এবং আমি তাদের সবাইকে আমার বিশেষ নৈকট্যের উপযোগী করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৭২]
১৩. অতঃপর ওই সূরার ৭৩ নং আয়াতে উক্ত পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মক্বাম তথা মর্যাদার আরো বিবরণ দেয়া হয়েছে: “এবং আমি তাদেরকে ‘ইমাম’ করেছি, যারা আমার নির্দেশে আহ্বান করে আর আমি তাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি – সৎকর্ম পালন করতে, নামায প্রতিষ্ঠিত রাখতে এবং যাকাত প্রদান করতে; আর তারা আমার ইবাদত করতো।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৭৩]
১৪. উক্ত সূরার ৭৬-৮৪ আয়াতগুলো সর্ব-পয়গম্বর নূহ (আ:), দা’উদ (আ:), সুলাইমান (আ:) ও আইয়ূব (আ:)-এর কথাও উল্লেখ করেছে। এই স্মরণের পরিসমাপ্তি হয় পয়গম্বর আইয়ূব (আ:)-এর উল্লেখ দ্বারা: “অতঃপর আমি তার (অর্থাৎ, আইয়ূব আলাইহিস্ সালামের) প্রার্থনা শুনেছি। তখন তার যে দুঃখ-কষ্ট ছিল, আমি তা দূরীভূত করেছি, এবং আমি তাকে তার পরিজনবর্গ ও তাদের সাথে তদসংখ্যক আরো দান করলাম; এটা আমার নিকট থেকে এক (বিশেষ) দয়া এবং ইবাদতকারীদের জন্যে (এতে নিহিত রয়েছে) উপদেশ (এই মর্মে যে আল্লাহ ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতাকে পুরস্কৃত করে থাকেন)।” [আল-কুরআন, ২১:৮৪]
১৫. এর পরবর্তী আয়াতে করীমাতেই সর্ব-পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:), ইদরীস্ (আ:) ও যূল-কিফল (আ:)-এর কথা উল্লেখিত হয়েছে: “এবং ইসমাঈল, ইদরীস্ ও যূল-কিফলকে (স্মরণ করুন)। তারা সবাই ধৈর্যশীল ছিল। এবং তাদেরকে আমি আপন অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। নিশ্চয় তারা আমার বিশেষ নৈকট্যের উপযোগীদের অন্তর্ভুক্ত।” [আল-কুরআন, ২১:৮৫-৮৬]
১৬. অতঃপর উক্ত সূরার ৮৭-৯০ আয়াতগুলোতে সর্ব-পয়গম্বর ইউনুস (যূননুন খেতাবে পরিচিত), যাকারিয়্যা ও ইয়াহইয়ার (সবার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক) উল্লেখ করা হয়েছে; এই যিকরের পরিসমাপ্তি ঘটেছে তাঁদের আধ্যাত্মিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে: “নিশ্চয় তারা সৎকর্মসমূহে ত্বরা করতো এবং আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতির সাথে, আর আমার দরবারে বিনীতভাবে প্রার্থনা করতো।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৯০]
১৭. আল্লাহতা’লা এরপর তাঁরই আশীর্বাদধন্য ও প্রিয় এসব বান্দার কথা স্মরণ করার উদ্দেশ্যটুকু ব্যাখ্যা করে এরশাদ ফরমান: “নিশ্চয় এ কুরআন যথেষ্ট এবাদতকারীদের জন্যে।” [আল-কুরআন, ২১:১০৬]
১৮. এই পুরো সূরাটি-ই আল্লাহর সম্মানিত বান্দাদের নিরবচ্ছিন্ন এক যিকর তথা স্মরণ, কিন্তু এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছে যখন শাহেনশাহ-এ-মাহবুবীন (প্রিয়বান্দাদের মহারাজ) ও বিশ্বজগতের জন্যে আল্লাহতা’লার পরম করুণা (রহমত) মহানবী (দ:)-এর কথা উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহতা’লার নেয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের এই স্মরণের সমাপ্তি হয়েছে নিম্নের এই ভাষ্য দ্বারা: “আর আমি আপনাকে (হে রাসূল) সমগ্র জগতের জন্যে রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ২১:১০৭]
১৯. এরপর আর কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর ব্যাপারে উল্লেখ করা নেই, কেননা মহব্বতের এই স্মৃতিচারণ তার চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছে। মহানবী (দ:)-এর যিকর-তাযকেরা’র পরে অধ্যায়টির পরিসমাপ্তি ঘটেছে মহান আল্লাহতা’লার যিকর (স্মরণ) দিয়ে; এরশাদ হয়েছে: “নবী আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! ন্যায় মীমাংসা করে দিন এবং আমাদের রব্ব রহমানেরই সাহায্য আবশ্যক ওইসব কথার ওপর, যা তোমরা বলছো।” [আল-ক্বুরআন, ২১:১১২, তাফসীরে নূরুল এরফান]
২০. সূরা সা’আদ-এ আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং স্মরণ করুন ইসমাঈল, ইয়াসা ও যূল-কিফল’কে এবং (তারা) সবাই সজ্জন।” [আল-ক্বুরআন, ৩৮:৪৮]
এই পাঁচটি অধ্যায় হতে মাত্র কয়েকটি আয়াত-ই (এখানে) নির্বাচন করা হয়েছে; নতুবা আল্লাহতা’লা তাঁরই প্রিয় বান্দাদের কথা উল্লেখ করেছেন এমন উদ্ধৃতি কুরআন মজীদে ভরপুর। এসব উদ্ধৃত অংশে প্রিয় বান্দাদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও প্রচেষ্টাকে স্মরণ করা হয়েছে; এই নেয়ামত-প্রাপ্ত (মানে আশীর্বাদধন্য) বান্দাদের উচ্চারিত দোয়া/প্রার্থনা-বাক্য ও সেগুলোর বর্ণনাপ্রসঙ্গ এবং ধরন সবই বর্ণিত হয়েছে। উপরন্তু, তাঁরা যে ঐশী অনুগ্রহ ও দান পেয়েছেন তার পাশাপাশি তাঁদের দৃঢ়তা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথাও উল্লেখিত হয়েছে। সংক্ষেপে, তাঁদের জীবনের কোনো দিক-ই বাদ দেয়া হয়নি, আর প্রত্যেককে বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে এসব যিকর-তাযকিরা শুধু তাঁদের জন্যেই সুনির্দিষ্ট, যাঁরা আল্লাহর এবাদত-বন্দেগী ও আনুগত্যে অটল, অবিচল।
কেউ আল্লাহতা’লার রেযামন্দি (সন্তুষ্টি) ও নৈকট্যলাভের মাধ্যম হিসেবে এবাদত-বন্দেগী ও আনুগত্যকে গ্রহণ করতে চাইলে এই যিকর-তাযকিরা’কে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার উৎস হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এই কারণেই মহান সাহাবাবৃন্দের (রা:) সময়কাল হতে অদ্যাবধি, প্রতিটি যুগেই, সৃষ্টিকুল শিরোমণি প্রিয়নবী (দ:)-এর পবিত্র জীবনবৃত্তান্তের যিকর-তাযকিরা ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হয়েছে। ইমামমণ্ডলী, মুহাদ্দেসীন ও আল্লাহতা’লার সকল পুণ্যবান বন্ধু (আউলিয়া) নিজ নিজ প্রকৃতি অনুসারে মহানবী (দ:)-এর যিকর-তাযকেরায় সমাবেশের আয়োজন করেছেন; আর প্রতিটি যুগেই এই ঐশী প্রথা সম্পর্কে শত শত গ্রন্থ লেখা কিংবা সংকলন করা হয়েছে।
ক্বুরআন মজীদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের বর্ণনাগুলো স্বয়ং আল্লাহতা’লাই করেছেন। এক্ষেত্রে মওলিদের স্মরণ বা স্মৃতিচারণ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ (রীতি)।
৩.৩ আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের তাৎপর্য
মহব্বতের কেউ জন্মগ্রহণ করলে তা যে কোনো ব্যক্তির জন্যেই খুশির উপলক্ষ হয়। এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে জন্মদিনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অধিকন্তু, এর গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পায় তখন-ই, যখন উপলক্ষটি কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদতের সাথে সম্পর্কিত হয়। আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) নিজে থেকেই আল্লাহতা’লার সেরা আশীর্বাদগুলোর অন্যতম। কোনো জাতির পয়গম্বরের (আ:) বেলাদতের মাধ্যমে সে জাতিকে অন্যান্য সব নেয়ামত দান করা হয়। বিশেষ করে সর্বশেষ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হচ্ছেন হেদায়াত ও ঐশীবাণী প্রাপ্তির দ্বার। তাঁর মাধ্যমেই আমরা কুরআন মজীদ ও রমজান মাস পেয়েছি। বস্তুতঃ আমরা যতো রহমত-বরকত-নেয়ামত লাভ করেছি, তা রবিউল আউয়াল মাসের সেই আলোকিত ও আশীর্বাদপূর্ণ ভোরের বদৌলতেই পেয়েছি, যে শুভলগ্নে আমাদের মাহবূব (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এই ধূলির ধরায় শুভাগমন করেন। তাই তাঁর বেলাদতে খুশি হওয়া এবং তা উদযাপন করা তাঁরই প্রতি ঈমানের লক্ষণ, আর এটা মহানবী (দ:)-এর প্রতি কারো ব্যক্তিগত আন্তরিক অনুভূতিরই প্রতিফলন বা বহিঃপ্রকাশ।
আল-ক্বুরআন কয়েকজন পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদতের কথা উল্লেখকালে ওই দিনগুলোর তাৎপর্য ও উত্তম বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিহ্নিত করে।
১. পয়গম্বর এয়াহইয়া (আ:)-এর বেলাদত প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান: “এবং শান্তি তার (এয়াহইয়ার)-ই প্রতি, যেদিন জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।” [আল-কুরআন, ১৯:১৫]
২. কুরআন মজীদে পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর কথাও উদ্ধৃত হয়েছে: “এবং ওই শান্তি আমার প্রতি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং যেদিন আমার মৃত্যু হবে আর যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবো।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:৩৩]
৩. মহানবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কে আল্লাহতা’লা শপথ করছেন এই বলে: “আমায় এ শহরের (মক্কার) শপথ, যেহেতু হে মাহবূব! আপনি এ শহরে তাশরীফ এনেছেন, এবং আপনার পিতা (পিতৃপুরুষ) ইব্রাহীমের শপথ এবং তার বংশধরের, অর্থাৎ, আপনি-ই।” [আল-ক্বুরআ’ন, ৯০:১-৩]
কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদতের বিশেষ তাৎপর্য যদি কুরআন ও সুন্নাহ’তে না-ই থাকতো, তাহলে এই দিনকে কেন দোয়া প্রার্থনা ও শপথের জন্যে আলাদাভাবে বেছে নেয়া হয়েছে? এটা স্পষ্ট যে এই দিনটি তাৎপর্যময়, যেমনটি আল্লাহ পাক উল্লেখ করেছেন। নিচে আল-কুরআনে প্রদত্ত কিছু সংখ্যক আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের বিবরণ পেশ করা হলো:
৩.৩.১ পয়গম্বর আদম (আ:)-এর মওলিদ
আল্লাহতা’লার আশীর্বাদধন্য বান্দাদের মধ্যে মানবজাতির পিতা পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টিসম্পর্কিত বর্ণনা কুরআনে সর্বপ্রথম দেয়া হয়েছে এভাবে: “এবং স্মরণ করুন! যখন আপনার রব্ব ফেরেশতাদেরকে বল্লেন, ’আমি পৃথিবীতে আপন প্রতিনিধি সৃষ্টিকারী।’” [আল-কুরআন, ২:৩০]
সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টিরও আগে তাঁর মওলিদ সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন, নিম্নের আয়াতগুলোতে তা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আদম (আ:)-কে যখন তাঁর মানবাকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়, ফেরেশতাকুলকে আদেশ করা হয় তাঁর প্রতি সেজদা করতে; কিন্তু ইবলীস (শয়তান) বেয়াদবি করলে তাকে আল্লাহর দরবার থেকে বের করে দেয়া হয়। পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টির পূর্ণ বিবরণ রয়েছে নিচে:
এবং স্মরণ করুন, যখন আপনার রব্ব ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি মানুষ সৃষ্টিকারী ঠনঠনে মাটি থেকে, যা দুর্গন্ধময় কালো কাদা থেকেই। অতঃপর যখন আমি সেটাকে ঠিক করে নেই এবং সেটার মধ্যে আমার কাছ থেকে বিশেষ সম্মানিত রূহ ফুৎকার করে দেই, ‘তখন সেটার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে পড়ো!’ তখন যতো ফেরেশতা ছিল সবাই একত্রে সেজদাবনত হয়ে পড়লো, ইবলীস ব্যতিরেকে। সে সেজদাকারীদের সঙ্গি হতে অস্বীকার করলো। [আল-কুরআন, ১৫:২৮-৩১]
কুরআন মজীদের অসংখ্য স্থানে পয়গম্বর আদম (আ:) সম্পর্কে বিশদভাবে আলোকপাত করা হয়েছে – শুধুমাত্র তাঁর সৃষ্টির বিষয়ে নয়, বরঞ্চ তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক, যেমন বেহেশতে তাঁর আবাস, তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে ফেরেশতাদের ভাবনা, অভিশপ্ত শয়তানের আপত্তি ও পয়গম্বর আদম (আ:)-কে সেজদা করার ক্ষেত্রে শয়তানের ব্যর্থতা, এসব-ই বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষ সৃষ্টিসংক্রান্ত যতোগুলো আয়াত রয়েছে, সবগুলোই পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট; এটাই তাঁর মওলিদ বা মওলূদ হিসেবে জ্ঞাত।
৩.৩.২ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর মওলিদ
পয়গম্বর মূসা (আ:) হচ্ছেন সেই মহান পয়গম্বর, যাঁকে খোদা দাবিদার নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসক ফেরাউনের মোকাবেলা করার জন্যে প্রেরণ করা হয়েছিল। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁকে পাঠিয়ে বনূ ইসরাঈল জাতিকে ফেরাউনের অত্যাচার-নিপীড়ন ও বিশ্বাসঘাতকতা হতে রক্ষা করেছিলেন; এরই ফলশ্রুতিতে ফেরাউন পানিতে ডুবে মরে এবং (খোদার) উপদেশের এক (স্মারক) চিহ্নে সে পরিণত হয়; আর মানবতার জন্যেও এক শিক্ষা হয়ে থাকে। ফেরাউনের গণকবর্গ তাকে জানায় যে সহসা এক শিশুর জন্ম হতে যাচ্ছে যিনি তার সিংহাসন উল্টে ফেলবেন। ফলে ফেরাউন এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তার অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সে পুত্র-শিশুদের হত্যা করতে বলে, আর মেয়ে-শিশুদের জীবিত ছেড়ে দেয়। এমনি এক পরিস্থিতিতে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর বেলাদত হয়, যেমনটি আল্লাহতা’লা কর্তৃক উল্লেখিত হয়েছে কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে করীমায়।
সূরা আল-ক্বাসাস আরম্ভ হয় এই ঘটনার বর্ণনা দ্বারা, যেটা ৫০টি আয়াতের সমষ্টি। প্রথম পাঁচটি আয়াত পয়গম্বর মূসা (আ:)-সম্পর্কিত বর্ণনাসম্বলিত। নিচে প্রথম ১৪টি আয়াত উদ্ধৃত হলো, যেগুলো তাঁর বেলাদত হতে যৌবনকাল পর্যন্ত বিবরণ দেয়, যা দ্বারা এই বাস্তবতা ফুটে ওঠেছে যে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মওলিদকে স্মরণ করা আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ। এরশাদ হয়েছে:
ত্বোয়া- সী—-ম্ মী—-ম। এ আয়াতগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি আপনার প্রতি পাঠ করি মূসা ও ফেরাউনের সত্য সংবাদ ওই সমস্ত লোকের জন্যে, যারা ঈমান রাখে। নিশ্চয় ফেরাউন পৃথিবীতে কর্তৃত্ব লাভ করেছিল এবং তার লোকজনকে তার অনুসারী করেছে; তাদের মধ্যে একটা দলকে দুর্বল দেখতো, তাদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করতো এবং তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখতো। নিশ্চয় সে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ছিল। আর আমি চাচ্ছিলাম ওই দুর্বলদের প্রতি অনুগ্রহ করতে এবং তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে, আর তাদেরকে তাদের দেশ ও ধনসম্পদের অধিকারী করতে; আর তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যবাহিনীকে তাই দেখিয়ে দিতে, যার আশঙ্কা তাদের মনে এদের দিক থেকে রয়েছে। এবং আমি মূসার মাকে গোপন-প্রেরণা দিয়েছি যে, ‘তাকে দুধ পান করাও। অতঃপর যখন তার সম্পর্কে তোমার আশঙ্কা হয়, তবে তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো আর না ভয় করো এবং না দুঃখ। নিশ্চয় আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে আনবো এবং তাকে রাসূল করবো।’ অতঃপর তাকে উঠিয়ে নিলো ফেরাউনের পরিবারের লোকজন, যেন সে তাদের শত্রু ও তাদের দুঃখের কারণ হয়। নিশ্চয় ফেরাউন ও হামান এবং তাদের সৈন্যদল অপরাধী ছিল। এবং ফেরাউনের স্ত্রী বললো, ‘এ শিশু আমার ও তোমার নয়নের শান্তি, তাকে হত্যা করো না; হয়তো এটা আমাদের উপকারে আসবে, অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেবো।’ এবং তারা বুঝতে পারেনি। এবং সকালে মূসার মায়ের হৃদয় ধৈর্যহীন হয়ে পড়লো। অবশ্য সে তার অবস্থা প্রকাশ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছিল যদি আমি তার অন্তরকে দৃঢ় করে না দিতাম, যাতে সে আমার প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাশীল থাকে। এবং তার মা তার বোনকে বললো, ‘তার পেছনে পেছনে চলে যা।’ অতঃপর সে তাকে দূর থেকে দেখছিল এবং ওদের জানা ছিল না। এবং আমি আগে থেকেই সমস্ত ধাত্রীকে তার জন্যে হারাম করে দিয়েছিলাম। সুতরাং সে বললো, ‘আমি তোমাদেরকে কি এমন পরিবারের সন্ধান দেবো, যারা তোমাদের এ শিশুকে লালন-পালন করবে এবং তারা তার মঙ্গলকামী?’ অতঃপর আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে মায়ের চোখ জুড়ায় এবং দুঃখ না করে আর জেনে নেয় যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। আর সে যখন আপন যৌবনে উপনীত হলো এবং পূর্ণ শক্তিপ্রাপ্ত হলো, তখন আমি তাকে হুকুম ও জ্ঞানদান করলাম, আর আমি অনুরূপ পুরস্কার প্রদান করি সৎকর্মপরায়ণদেরকে। [আল-কুরআন, ২৮:১-১৪]
এই ১৪টি আয়াতে আল্লাহতা’লা নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোর উল্লেখ করেছেন: পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর বেলাদতের পূর্ববর্তী ঘটনাবলী, তাঁর বেলাদতের মুহূর্ত, আল্লাহরই আদেশে তাঁকে একটি ঝুড়িতে/পাত্রে রাখা, ফেরাউনের পরিবারে তাঁকে নিয়ে যাওয়া এবং অবশেষে তাঁকে তাঁর মায়ের জিম্মায় রেখে দুধপান করে পূর্ণ যৌবনে উপনীত করা। এটাই হচ্ছে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর মওলিদ।
৩.৩.৩ মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদ
সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর পাক কালামে হযরত মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি কোনো নবী ছিলেন না, বরং একজন পুণ্যবতী মহিলা, ওলী/দরবেশ ছিলেন, আর ছিলেন মনোনীত পয়গম্বর হযরত ঈসা (আ:)-এর মহান মাতা। তাঁর মওলিদের বর্ণনা প্রদানের আগে আল্লাহতা’লা প্রথমে তাঁর কতিপয় পয়গম্বর (আ:) ও তাঁদের কুলীন বংশধরদের কথা উল্লেখ করেন; তিনি এরশাদ ফরমান:
নিঃসন্দেহে আল্লাহ মনোনীত করেছেন আদম, নূহ, ইব্রাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরদেরকে সমগ্র বিশ্বজগত থেকে। এটা একটা বংশানুক্রম, একে অপর হতে এবং আল্লাহ শোনেন, জানেন। [আল-কুরআন, ৩:৩৩-৩৪]
এই ভূমিকার পরে মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের সূচনা হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো আপত্তি উত্থাপন করতে পারেন যে কুরআন মজীদ যেহেতু স্রেফ অতীত ঘটনাবলীর বর্ণনা দিয়েছে, সেহেতু এটাকে কীভাবে মওলিদ বলে দাবি করা যায়? যারা এই আপত্তি তোলেন, তাদের বোঝা উচিত যে শিক্ষা ও হেদায়াত তথা সঠিক পথের দিক-নির্দেশনার উদ্দেশ্যে যেসব বিষয়, সেগুলোর সীমিত পরিসর; অর্থাৎ, কেবল বিষয়বস্তুর সাথে যেসব বিষয় প্রাসঙ্গিক, সেগুলোরই উল্লেখ প্রয়োজনীয়; পক্ষান্তরে, অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো কুরআনী শিক্ষার অংশ হিসেবে গঠিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন-ই নেই। নিম্নের আয়াতগুলো মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের কথা স্মরণ করে; এগুলো কোনো বিশেষ শিক্ষা বা হেদায়াত দানের জন্যে উপস্থাপিত হয়নি, বরঞ্চ এগুলো স্রেফ তাঁরই বেলাদতের ঘটনা স্মরণ করার উদ্দেশ্যে বর্ণিত। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:
(স্মরণ করুন) যখন ইমরানের স্ত্রী আরয করলো, ‘হে আমার রব্ব, আমি আপনার জন্যে মানত করছি যা আমার গর্ভে রয়েছে যে, একান্ত আপনারই সেবায় থাকবে। সুতরাং আপনি আমার কাছ থেকে কবূল করে নিন। নিঃসন্দেহে আপনি-ই হন শ্রোতা, জ্ঞাতা।’ অতঃপর যখন তাকে প্রসব করলো, তখন বললো, ’হে আমার রব্ব! এ তো আমি কন্যা প্রসব করলাম।’ এবং আল্লাহর সম্যক জানা আছে যা সে প্রসব করেছে। আর ওই পুত্র সন্তান, যা সে চেয়েছে, এ কন্যা সন্তানের মতো নয়। (সে বললো) ‘এবং আমি তার নাম মরিয়ম রাখলাম। আর তাকে এবং তার বংশধরকে আপনার আশ্রয়ে দিচ্ছি বিতাড়িত শয়তান থেকে।’ [আল-কুরআন, ৩:৩৫-৩৬]
এটাই আল্লাহতা’লার প্রদত্ত মরিয়ম (আ:)-এর বেলাদতের চমৎকার বিবরণ। পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর সেবাযেত্নে বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশবের বর্ণনা দেয়া হয়েছে নিম্নের আয়াতগুলোতে। ওই সময়কালে আল্লাহতা’লার বর্ষিত নেয়ামত ও তাঁরই প্রদত্ত বে-মওসূমি ফল-ফলাদির বিবরণ-ও এসব আয়াতে হয়েছে বিধৃত। পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) মরিয়ম (আ:)-এর বসতভিটার অসীলা (দোহাই) দিয়ে আল্লাহর কাছে সন্তানপ্রাপ্তির জন্যে দোয়া করেন, যার দরুন আল্লাহতা’লা তাঁকে (পুত্র) পয়গম্বর এয়াহইয়া (আ:)-এর খোশ-খবরী (সুসংবাদ) দেন। এরশাদ হয়েছে:
অতঃপর তাকে (মরিয়মকে) তার রব্ব উত্তমরূপে গ্রহণ করলেন এবং তাকে উত্তমরূপে প্রতিপালন করলেন, আর তাকে যাকারিয়্যার তত্ত্বাবধানে দিলেন। যখন যাকারিয়্যা তার কাছে তার নামায পড়ার স্থানে যেতেন, তখন তার কাছে নতুন রিযক্ব পেতেন। বললো, ‘হে মরিয়ম! এটা তোমার কাছে কোত্থেকে এলো?’ বললেন, ‘সেটা আল্লাহর কাছ থেকে।’ নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত দান করেন। [আল-কুরআন, ৩:৩৭]
ওপরোক্ত আয়াতগুলো মরিয়ম (আ:)-এর শৈশবকাল ও বেড়ে ওঠার সাথে সম্পৃক্ত। তবে এখানেই  এর শেষ নয়; সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা আরো ব্যাখ্যা করেন এমন ছোটখাটো বিষয়ও, যেখানে বিবৃত হয় মরিয়ম (আ:)-এর সেবাযত্নের দায়দায়িত্ব নেয়ার প্রশ্নে ধর্মীয় নেতৃবর্গ কীভাবে তর্কবিতর্ক করেছিল। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন:
(স্মরণ করুন) এবং যখন ফেরেশতাবৃন্দ বললো, ‘হে মরিয়ম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করে নিয়েছেন, খুব পবিত্র করেছেন এবং আজকার সমগ্র বিশ্বের নারীদের থেকে তোমাকে মনোনীত করেছেন।’ ‘হে মরিয়ম! নিজ রব্বের সম্মুখে আদব সহকারে দণ্ডায়মান হও এবং তাঁর জন্যে সাজদা করো ও রুকূ’কারীদের সাথে রুকূ’ করো।’ এগুলো অদৃশ্যের সংবাদ, যেগুলো আমি গোপনভাবে আপনাকে বলে থাকি এবং আপনি তাদের কাছে ছিলেন না যখন তারা তাদের কলমগুলো দ্বারা লটারী টানছিল (এ বিষয়ে) যে, মরিয়ম কার লালন-পালনের দায়িত্বে থাকবে! আর আপনি তাদের কাছে ছিলেন না যখন তারা বাদানুবাদ করছিল। [আল-কুরআন, ৩:৪২-৪৪]
এই হলো মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদ, যা’তে দৃশ্যতঃ ছোটখাটো বিবরণ-ও প্রদান করা হয়েছে, যেমন – ধর্মীয় নেতৃবর্গ কর্তৃক নিজেদের কলম ছুঁড়ে মারা, লটারী করা এবং পারস্পরিক তর্কবিতর্ক করা। এসব বিবরণের কোনোটির সাথেই শিক্ষা বা হেদায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। পক্ষান্তরে, প্রিয়নবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতের বিবরণ ও উন্নত বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে উল্লেখ এমনই এক মাধ্যম যা দ্বারা ঈমানকে নিখুঁত করা হয় এবং পূর্ণতা দেয়া হয়। আর এর মাধ্যমেই আমরা আল্লাহতা’লার সুন্নাহ’কে আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হই। মানুষেরা যদি এ কথা বুঝতে পারতো একজন পুণ্যবতী, দরবেশ মহিলার মওলিদের কথা কুরআন মজীদে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের পবিত্র মওলিদের কথা উল্লেখ কেন নয়? মহানবী (দ:)-এর মওলিদের উল্লেখ করা কোনোক্রমেই বেদআত (নব্য প্রথা) নয়; বরঞ্চ এটা প্রকৃত ঈমানদারির বহিঃপ্রকাশ এবং তওহীদ তথা একত্ববাদের মূল বৈশিষ্ট্য।
৩.৩.৪ পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ
সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) যখন মরিয়ম (আ:)-এর যত্ন নিচ্ছিলেন, তখন তিনি মরিয়ম (আ:)-এর বসতভিটায় ওই (বরকতময়) স্থানকে অসীলা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। এ সম্পর্কে মহান প্রভু এরশাদ ফরমান:
“এখানে প্রার্থনা করলেন যাকারিয়্যা আপন রব্বের কাছে। আরয করলেন, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে আপনার কাছ থেকে প্রদান করুন পবিত্র সন্তান। নিশ্চয় আপনি-ই প্রার্থনা শ্রবণকারী।’ তখন ফেরেশতাবৃন্দ তাকে সাড়া দিলো এবং তিনি আপন নামাযের স্থানে দণ্ডায়মান অবস্থায় নামায পড়ছিলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহইয়ার, যে আল্লাহর পক্ষের একটা কলেমার সত্যায়ন করবেন এবং সরদার ও সব সময়ের জন্যে নারীদের থেকে বিরত থাকবেন এবং নবী, আমার খাস বান্দাদের মধ্য থেকে (হবেন)।’ বললেন, হে আমার রব্ব! আমার সন্তান কোত্থেকে হবে? আমি তো বার্ধক্যে উপনীত এবং আমার স্ত্রী-ও বন্ধ্যা।’ এরশাদ করলেন, ‘আল্লাহ এভাবেই করেন, যা চান।’ আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! আমার জন্যে কোনো নিদর্শন করে দিন!’ এরশাদ করলেন, ‘তোমার নিদর্শন এ-ই যে তিন দিন পর্যন্ত তুমি লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলবে না, কিন্তু ইঙ্গিতে-ইশারায় এবং অাপন রব্বকে খুব স্মরণ করো; আর বিকেলে ও প্রভাতে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো।’ [আল-ক্বুরআন, ৩:৩৮-৪১]
এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার যে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর তখনো বেলাদত তথা ধরণীতলে আবির্ভাব ঘটেনি। শুধু পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর দোয়া কবূল হয়েছিলমাত্র। এমন কি তাঁর বেলাদতের আগেই আল্লাহতা’লা তাঁর কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা  এখানে উল্লেখ করেছেন। অধিকন্তু, সূরা মরিয়মে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর বেলাদতের কথা পুরোপুরি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে প্রথম আয়াতটি তাঁর মওলিদের বর্ণনা দ্বারা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে:
“কা—-ফ হা-ইয়া-  ‘আঈ—-ন সোয়া—-দ (কেবল আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-ই এর প্রকৃত অর্থ জানেন)। এটা হচ্ছে বিবরণ আপনার রব্বের ওই অনুগ্রহের, যা তিনি আপন বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি করেছেন।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:১-২]
এসব আয়াতে  জানা যায় যে কোনো পয়গম্বরের (আ:) বেলাদত/মওলিদকে স্মরণ করাটা কুরআন মজীদে আল্লাহতা’লার করুণা হিসেবে ব্যক্ত হয়েছে। পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদের স্মরণ যদি আল্লাহর রহমত তথা করুণারই স্মরণ হয়, তাহলে প্রিয়নবী (দ:)-এর মওলিদের স্মরণ-ও কেন আল্লাহর রহমতের স্মরণ হতে পারবে না? সমগ্র বিশ্বজগতের জন্যে খোদার রহমত হিসেবে যিনি প্রেরিত হয়েছেন, তাঁর থেকে সেরা আর কী রহমত হতে পারে? অতএব, যৌক্তিকভাবে বলতে গেলে মহানবী (দ:)-এর মওলিদের স্মরণ প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহতা’লারই রহমতের স্মরণ বটে।
আল-কুরআন পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদকে খোদার রহমত বলে উল্লেখ করেছে নিম্নবর্ণিত কারণে; এরশাদ হয়েছে:
“যখন তিনি (যাকারিয়্যা) আপন রব্বকে নীরবে আহ্বান করেছেন। আরয করলেন, ‘হে আমার প্রভু! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে আর মাথা থেকে বার্ধক্যের শিখা প্রকাশ পেয়েছে (মানে সাদা হয়েছে),  এবং হে আমার রব্ব! আপনাকে আহ্বান করে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি। এবং আমার মনে আমার পরে আপন স্বজনদের সম্পর্কে আশঙ্কা রয়েছে; আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; সুতরাং আমাকে আপনার কাছ থেকে এমন কাউকে দান করুন, যে আমার কাজ সম্পাদন করবে। সে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়া’কুবের বংশধরদের উত্তরাধিকারী হবে; এবং হে আমার রব্ব! তাকে পছন্দ করুন।’ হে যাকারিয়্যা! আমি তোমাকে সুসংবাদ শুনাচ্ছি এক পুত্রের, যার নাম ইয়াহইয়া; এর পূর্বে আমি এ নামে কাউকেও নামকরণ করিনি। আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! আমার পুত্র কোত্থেকে হবে? আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা এবং আমি বার্ধক্যের কারণে শুকিয়ে যাবার উপক্রম।’ (আল্লাহ) বললেন, ‘এরকম-ই হবে।’ তোমার রব্ব বলেছেন, ‘তা আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং আমি এর আগে তোমাকে ওই সময়ে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’ আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! আমাকে কোনো নিদর্শন দিন।’ (আল্লাহ) বললেন, ‘তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি তিন রাত-দিন মানুষের সাথে বাক্যালাপ করবে না একেবারে সুস্থ থাকা সত্ত্বেও।’ অতঃপর মসজিদ থেকে আপন সম্প্রদায়ের কাছে বের হয়ে এলেন, তারপর তাদেরকে ইঙ্গিতে বললেন, ‘সকাল-সন্ধ্যায় (আল্লাহর) পবিত্রতা ঘোষণা করতে থাকো।’ ‘হে ইয়াহইয়া! কিতাবটা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো।’ এবং আমি তাকে শৈশবেই নবূয়ত প্রদান করেছি। এবং আমার কাছ থেকে দয়া ও পবিত্রতা; আর (তিনি) পরিপূর্ণ খোদভীরু (বান্দা) ছিলেন। এবং আপন মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী ছিলেন, উদ্ধত ও অবাধ্য ছিলেন না। এবং শান্তি তারই প্রতি যেদিন জন্মগ্রহণ করেছেন, যেদিন বেসালপ্রাপ্ত হবেন এবং যেদিন হায়াতে পুনরুত্থিত হবেন।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:৩-১৫; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (রহ:) প্রণীত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]
সূরার এই প্রাথমিক আয়াতগুলো সম্পূর্ণভাবে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদের স্মরণেই নির্দিষ্ট হয়েছে, যেখানে তাঁর বেলাদতের কথা উল্লেখিত হয়েছে এবং তাঁরই জন্যে পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর কৃত দোয়ার ব্যাপারেও উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর বেলাদতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন; আর যখন পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) তাঁর বিস্ময়ের কথা ব্যক্ত করেন, তখন আল্লাহ পাক নিজ কুদরত তথা সর্বশক্তিমান হওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে, আল্লাহতা’লা ও পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর মাঝে যে বাক্যালাপ হয়েছিল, তার সম্পূর্ণ বিবরণ কুরআন মজীদে বিবৃত হয়েছে। অতঃপর পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর আধ্যাত্মিক মাকাম (স্তর)-এর কিছু দিক এবং তাঁরই জীবনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত ও জীবনের ঘটনাবলী উল্লেখের পরে এই বর্ণনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে তাঁর বেলাদত, বেসালপ্রাপ্তি ও শেষ বিচার দিবসে পুনরুত্থানের প্রতি শান্তি বর্ষণের মাধ্যমে। আল-কুরআনে এসব ঘটনা স্মরণ করার উদ্দেশ্য হলো, আমাদের মস্তিষ্কে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদের তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এটাই হচ্ছে কুরআনে বর্ণিত পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ।
৩.৩.৫ পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদ
কুরআন মজীদে মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের উল্লেখের পরপরই তাঁর পুত্র পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদের কথা উল্লেখিত হয়েছে। একটি গোটা উদ্ধৃতি তাঁর মওলিদের প্রতি উৎসর্গিত হয়েছে, যেখানে তাঁর মহান মাতাকে তাঁরই বেলাদতের আগে তাঁর ধরাধামে আবির্ভাবের সুখবর দেয়া হয়েছে। এরশাদ হয়েছে:
“এবং স্মরণ করুন! যখন ফেরেশতারা মরিয়মকে বললো, ‘হে মরিয়ম! আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন তাঁর কাছ থেকে একটা কলেমার, যার নাম হচ্ছে মসীহ ঈসা, মরিয়ম-পুত্র, মর্যাদাবান হবে দুনিয়া ও আখেরাতে এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত; এবং মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনায় ও পরিণত বয়সে আর খাস বান্দাদের অন্যতম হবে।’ বললো, ‘হে আমার রব্ব! আমার সন্তান কোত্থেকে হবে? আমাকে তো কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি।’ এরশাদ করলেন, ‘আল্লাহ এভাবেই সৃষ্টি করেন যা ইচ্ছা করেন। যখন কোনো কাজের হুকুম করেন, তখন তাকে এটাই বলে থাকেন, ‘হয়ে যাও!’ সেটা তৎক্ষণাৎ হয়ে যায়।” [আল-কুরআন, ৩:৪৫-৪৭]
পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে বিশদ আলোচনার পরে আরো ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, ফেরেশতা জিবরীল আমীন (আ:) কীভাবে মরিয়ম (আ:)-এর মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন,  আর তিনি কীভাবে এরপর সন্তান-সম্ভবা হন। সন্তান প্রসবকালে মরিয়ম (আ:) যে ব্যথা অনুভব করেন, এমন কি তা-ও বর্ণিত হয়েছে। আর অাল্লাহতা’লা তাঁর প্রসববেদনা উপশমে কীভাবে পানির নহর সৃষ্টি করেন এবং (তাজা) খেজুর সরবরাহ করেন, তারও উল্লেখ রয়েছে। পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর বেলাদতের মুহূর্তগুলো, পরবর্তীকালে সংঘটিত ঘটনাবলী (যা’তে মরিয়মকে দোষারোপ ও সমালোচনা করা হয়) এবং দোলনায় অবস্থানকারী পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত জবাব, এসব-ই আল্লাহতা’লা তাঁর কুরআন মজীদে উল্লেখ করেছেন এভাবে:
“এবং কিতাবে মরিয়মকে স্মরণ করুন! যখন আপন পরিবারবর্গ থেকে পূর্বদিকে পৃথক একস্থানে চলে গিয়েছিলো; অতঃপর তাদের দিক থেকে একটা পর্দা করে নিলো। তারপর তার প্রতি আমি আপন ‘রূহানী’ (মানে ফেরেশতা জিবরীল) প্রেরণ করেছি, সে তার সামনে একজন সুস্থ মানুষের রূপে আত্মপ্রকাশ করলো। (মরিয়ম) বললো, ‘আমি তোমার থেকে পরম করুণাময়ের আশ্রয় চাচ্ছি যদি তোমার মধ্যে খোদার ভয় থাকে।’ (ফেরেশতা) বললো, ‘আমি তো তোমার রব্বের প্রেরিত, আমি তোমাকে এক পবিত্র পুত্র (সন্তান) প্রদান করবো।’ বললো, ‘আমার পুত্র কোত্থেকে হবে, আমাকে তো কোনো মানুষ স্পর্শ করেনি, না আমি ব্যভিচারিনী?’ (ফেরেশতা) বললো, ‘এরকম-ই হবে’; তোমার রব্ব বলেছেন, ‘এটা আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং এ জন্যে যে, আমি তাকে মানুষের জন্যে নিদর্শন করবো এবং আমার কাছ থেকে একটা অনুগ্রহ; আর এ বিষয় চূড়ান্ত হয়ে গেছে।’ তখন মরিয়ম তাকে গর্ভে ধারণ করলো, অতঃপর তাকে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলো। অতঃপর তাকে প্রসব-বেদনা একটা খেজুর-বৃক্ষমূলে নিয়ে এলো। বললো, ‘হায়! এর পূর্বে কোনো মতে আমি যদি মরে যেতাম এবং লোকের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!’ অতঃপর তাকে তার নিম্নদেশ থেকে আহ্বান করলো, ‘তুমি দুঃখ করো না, নিশ্চয় তোমার রব্ব তোমার নিম্নদেশে একটা নহর প্রবাহিত করে দিয়েছেন। এবং খেজুর বৃক্ষের গোড়া ধরে নিজের দিকে নাড়া দাও, তখন তোমার ওপর তাজা-পাকা খেজুরসমূহ ঝরে পড়বে। সুতরাং তুমি আহার করো এবং পান করো আর চোখ জুড়াও। অতঃপর যদি তুমি কোনো মানুষ দেখো তবে বলে দিও, ‘আমি আজ ‘রাহমান’ (পরম  দয়ালু আল্লাহ)-এর উদ্দেশ্যে রোযার মানত করেছি, সুতরাং আজ কিছুতেই কোনো মানুষের সাথে কথা বলবো না।’ অতঃপর তাকে কোলে নিয়ে আপন সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলো। তারা বললো, ‘হে মরিয়ম! নিশ্চয় তুমি অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ করে বসেছো। হে হারূনের বোন! তোমার পিতা মন্দ লোক ছিলো না এবং না তোমার মাতা ব্যভিচারিনী।’ এর জবাবে মরিয়ম (আপন) সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করলো। তারা বললো, ‘আমরা কীভাবে কথা বলবো তারই সাথে, যে দোলনার শিশু?’ শিশুটি বললো, ‘আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী) করেছেন, আর তিনি আমাকে যেখানেই থাকি না কেন এবং আমাকে নামায ও যাকাতের তাকীদ দিয়েছেন যতোদিন আমি জীবিত থাকি, আর আমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারকারী এবং আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি; এবং ওই শান্তি আমার প্রতি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং যেদিন আমি বেসালপ্রাপ্ত হবো আর যেদিন জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবো।’ এ-ই হচ্ছে ঈসা, মরিয়ম-তনয়। সত্য কথা, যা’তে তারা সন্দেহ করছে। আল্লাহর জন্যে শোভা পায় না যে তিনি কাউকে আপন সন্তান স্থির করবেন। পকিত্রতা তাঁরই। যখন কোনো কাজের নির্দেশ দেন তখন এভাবেই সেটার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হয়ে যাও!’ সেটা তৎক্ষণাৎ হয়ে যায়।” [আল-কুরআন, ১৯: ১৬-৩৫]
৩.৩.৬ মনোনীত জন – মহানবী (দ:)-এর মওলিদ
পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মওলিদের কথা উল্লেখিত হয়েছে; এসব ঘটনার বিবরণ প্রদানকারী হলেন স্বয়ং আল্লাহতা’লা। কুরআন মজীদ কর্তৃক পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনকে ঘিরে বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ প্রদান, আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মো’জেযা তথা অলৌকিকত্ব ও আশীর্বাদের বর্ণনা দান এবং তাঁদের প্রতি বর্ষিত আল্লাহর নেয়ামতের উল্লেখকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখানো যে, এটা আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ; আর এসব আয়াত বারংবার তেলাওয়াত করার পক্ষেই আল-কুরআনের (দৃঢ়) অবস্থান। হয়তো এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে আল-কুরআনে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর মওলিদের উল্লেখ করা হয়েছে সত্য, কিন্তু আমাদের মহানবী (দ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে কি কোনো উল্লেখ এতে রয়েছে? এর উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ-সূচক: সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আশীর্বাদপূর্ণ মওলিদের উল্লেখ কুরআন মজীদে বিধৃত হয়েছে।
কুরআন পাকের গভীর অধ্যয়নে সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠবে যে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের বেলাদতের উল্লেখ দ্বারা আল্লাহতা’লা তাঁদের মান-মর্যাদাকে সুখ্যাতি দিয়েছেন। কেউ যদি কুরআনকে নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করেন, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন যে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মওলিদ স্রেফ তাঁদের বেলাদতকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনারই বর্ণনামাত্র। অথচ অপরদিকে, মহানবী (দ:)-এর মর্যাদা বিশেষভাবে পৃথক করা হয়েছে – আল্লাহতা’লা শুধু তাঁর বেলাদতের শহরের (মানে মক্কার) শপথ-ই নেননি, বরঞ্চ তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের নামেও কসম করেছেন। এরশাদ হয়েছে:
“আমায় এ শহরের শপথ, যেহেতু হে মাহবূব! আপনি এ শহরে তাশরীফ রাখছেন, এবং আপনার পিতা (পিতৃপুরুষ) ইব্রাহীমের শপথ এবং তার বংশধরের, অর্থাৎ আপনি-ই।” [আল-কুরআন, ৯০:১-৩]
মক্কায় অবস্থিত রয়েছে আল্লাহর ঘর, হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর), তাওয়াফ করার স্থান, মুলতাযাম, মাক্বা’ম-এ-ইবরাহীম, যমযম কূপ, আল-সা’ফা ও আল-মারওয়া; কিন্তু আল্লাহতা’লা এগুলোর কোনোটারই কসম কাটেননি। বরঞ্চ তিনি মক্কা শহরের শপথ করেছেন, কেননা এতে তাঁর মাহবূব (দ:)-এর বসতিস্থান রয়েছে। অতঃপর আল্লাহতা’লা প্রিয়নবী (দ:)-এর পিতৃপুরুষদের শপথ করেছেন। এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো, আল্লাহতা’লা কারোরই বেলাদতের ক্ষেত্রে শপথ নেননি, ব্যতিক্রম শুধু মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের বেলায়।
মহানবী (দ:)-এর প্রেরণ সম্পর্কে আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান:
“যেমন আমি তোমাদের মধ্যে প্রেরণ করেছি একজন রাসূল তোমাদের মধ্য থেকে, যিনি তোমাদের প্রতি আমার আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন, তোমাদেরকে (অর্থাৎ, তোমাদের অন্তর ও একগুঁয়ে নফসকে) পবিত্র করেন এবং কিতাব ও পরিপক্ক জ্ঞান শিক্ষা দেন। আর তোমাদের ওই (আধ্যাত্মিক ও ঐশী) জ্ঞান শিক্ষা দান করেন, যার জ্ঞান তোমাদের ছিল না।” [আল-কুরআন, ২:১৫১]
“নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের প্রতি যে, তাদের মধ্যে  তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের প্রতি তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পবিত্র করেন, আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন এবং তারা নিশ্চয় এর পূর্বে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিলো।” [আল-কুরআন, ৩:১৬৪]
“হে মানবজাতি! তোমাদের কাছে এ রাসূল সত্য সহকারে তোমাদেরই রব্বের কাছ থেকে শুভাগমন করেছেন; সুতরাং ঈমান আনো তোমাদের কল্যাণার্থে।” [আল-কুরআন, ৪:১৭০]
“হে কিতাবীরা! নিশ্চয় তোমাদের কাছে আমার এ রাসূল তাশরীফ এনেছেন, যিনি তোমাদের কাছে প্রকাশ করেন ওইসব বস্তু থেকে এমন অনেক কিছু, যেগুলো তোমরা কিতাবের মধ্যে গোপন করে ফেলেছিলে এবং অনেক কিছু (তিনি) ক্ষমা করে থাকেন। নিশ্চয় তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা ‘নূর’ এসেছে এবং স্পষ্ট কিতাব।” [আল-কুরআন, ৫:১৫]
“হে কিতাবীরা! নিঃসন্দেহে তোমাদের কাছে আমার এ রাসূল তাশরীফ এনেছেন, যিনি তোমাদের কাছে আমার বিধি-বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, এরপর যে, রাসূলবৃন্দের আগমন বহুদিন বন্ধ ছিলো, যাতে কখনো একথা না বলতে পারো যে ‘আমাদের কাছে কোনো সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী আসেননি।’ সুতরাং এ সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী তোমাদের কাছে তাশরীফ এনেছেন এবং আল্লাহর কাছেই রয়েছে চূড়ান্ত ক্ষমতা।” [আল-কুরঅান, ৫:১৯]
“নিশ্চয় তোমাদের কাছে তাশরীফ এনেছেন তোমাদের মধ্য হতে ওই রাসূল, যাঁর কাছে তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা (দর্শন) কষ্টদায়ক, তোমাদের কল্যাণ অতিমাত্রায় (যিনি) কামনাকারী, মুসলমানদের প্রতি পূর্ণ দয়ার্দ্র, দয়ালু।” [আল-কুরআন, ৯:১২৮]
“এবং আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্যে রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” [আল-কুরআন, ২১:১০৭]
“তিনি-ই (আল্লাহ), যিনি উম্মী মানুষদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যেন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন (বাইরে ও অভ্যন্তরে) এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের জ্ঞান দান করেন, আর অবশ্যঅবশ্য তারা ইতিপূর্বে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে ছিলো।” [আল-কুরআন, ৬২:২]
“নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি একজন রাসূল প্রেরণ করেছি।” [আল-কুরআন, ৭৩:১৫]
ওপরের আয়াতগুলোতে মহানবী (দ:)-এর শুভাগমন সম্পর্কে উল্লেখ আছে, আর এটা মূলতঃ তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতেরই যিকর-তাযকেরা (স্মরণ)। কেউ যদি গভীরভাবে এসব আয়াত সম্পর্কে চিন্তা করেন, তাহলে বোঝা যাবে যে আল্লাহতা’লা তাঁর মাহবূব (দ:)-এর বেলাদতের কথা উল্লেখ করেছেন গোটা মানবতাকে উদ্দেশ্যে করেই; ঈমানদারদের পাশাপাশি আহলে কেতাব (ইহুদী/খৃষ্টান), অবিশ্বাসী ও মুশরিকদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেককেই সচেতন করা হয়েছে যে আল্লাহর মাহবূব (দ:) শুভাগমন করতে যাচ্ছেন; তাঁর এই শুভাগমনকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্যে (আল্লাহর) করুণা ও আশীর্বাদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক তাঁর মাহবূব (দ:)-এর আবির্ভাবের যিকর তথা স্মরণকে এতো উচ্চমর্যাদা দিয়েছেন যে কেউই আর এটাকে হাল্কা ব্যাপার হিসেবে নিতে পারবে না।
আল্লাহতা’লা এসব আয়াতে করীমার মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদীকে শিক্ষা দিয়েছেন যে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতের স্মরণ অনাগত প্রজন্মগুলোর জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এরই আলোকে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের যিকর-তাযকেরার প্রয়োজনীয়তাকে যে মানসিকতা হেয় প্রতিপন্ন করে, তাকে আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের উল্লেখকারী ডজনকে ডজন আয়াতের প্রত্যাখ্যানকারী হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়। আমরা যখন মহানবী (দ:)-কে তাঁর মওলিদের পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণ করি, তখন আমরা আল্লাহরই সুন্নাহকে অনুকরণ-অনুসরণ করে থাকি এবং ফলশ্রুতিতে তাঁরই আদেশ মেনে চলি। এসব আয়াত, যেগুলোতে আল্লাহর আশীর্বাদধন্য বান্দাদের বেলাদতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো কেউ সযত্নে অধ্যয়ন করলে জানা যাবে যে সেসব ঘটনায় কোনো বিশেষ শিক্ষা বা পথপ্রদর্শনমূলক বার্তা নিহিত নেই (যা আমাদের জীবনে সরাসরি বাস্তবায়ন করা যায়); বরঞ্চ সেগুলো বিবরণ মাত্র, যার উদ্দেশ্য হলো (স্রেফ) আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদকেই স্মরণ করা।
৩.৪ আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদ হতে মহানবী (দ:)-এর মওলিদের ধারাবাহিকতা
সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর আশীর্বাদধন্য প্রিয় বান্দাদের মওলিদের স্মরণকে এতো উচ্চমর্যাদা দিয়েছেন যে এমন কি এসব প্রিয় বান্দার মনে যে সকল চিন্তার উদ্রেক হয়েছিল, সেগুলোরও তিনি উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে অধ্যয়ন করলে দেখতে পাবেন যে পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) মরিয়ম (আ:)-এর মঠরূপী আবাসস্থলে প্রবেশ করার পর সেখানে বে-মওসূমি ফল-ফলাদির খোঁজ পেয়ে তিনি সন্তানপ্রাপ্তির আশায় দোয়া করেছিলেন।আর যখন তাঁকে একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ পুত্রসন্তান-প্রাপ্তির খোশখবরি দেয়া হয়েছিল, তখন নিজের বার্ধক্য ও তাঁরই স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের কারণে কীভাবে সন্তান লাভ হবে সে সম্পর্কে তাঁর মনে এক চিন্তার উদ্রেক হয়। এরই ফলে তিনি আল্লাহতা’লাকে এব্যাপারে প্রশ্ন-ও করেন। কুরআন মজীদে এই ঘটনা ও এর প্রতি (খোদার) জবাব-ও উল্লেখিত হয়েছে।
অনুরূপভাবে, পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদের অধ্যয়ন-ও ঈমানকে দারুণভাবে সতেজ করে তোলে এবং চিন্তার খোরাক যোগায়। প্রদত্ত কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ের বিবরণ পাঠের পর কেউ স্রেফ থমকে একথা চিন্তা করবেন যে এসব বিবরণ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা কী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মরিয়ম (আ:)-এর অনুভূত প্রসববেদনা ও এই শঙ্কাবোধের বহিঃপ্রকাশ যে এর আগে যদি তাঁর মৃত্যু হতো এবং তিনি বিস্মৃত হতেন। পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর বেলাদতের সময় ফেরেশতা জিবরীল (আ:)-এর উপস্থিতি হতে আরম্ভ করে প্রতিটি খুঁটিনাটি বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। এসব বর্ণনা প্রদান করে আল্লাহতা’লা এই উম্মতকে সচেতন করে তুলেছেন এ মর্মে যে, আল-কুরআনে যেভাবে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মওলিদের পূর্ণ বৃত্তান্ত দেয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি তাঁর সর্বাধিক প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মওলিদের সময় যখন আগমন করবে তখন একই উপায়ে সেটারও স্মরণ করতে হবে। পয়গম্বর আদম (আ:)-এর ঔরস হতে পিতা আবদুল্লাহ’র ঔরস হয়ে মা আমেনা’র কোলে মহানবী (দ:)-এর নূরানী বেলাদত তথা জ্যোতির্ময় শুভাগমন ও তৎপরবর্তী পর্যায়ে (দুধ-মা) হালিমা আল-সা’দিয়া কর্তৃক লালন-পালন পর্যন্ত সমস্ত বিবরণ-ই প্রত্যেকের স্মরণ করা উচিত। এসব বর্ণনা এমনভাবে প্রদান করতে হবে যাতে প্রত্যক্ষকৃত সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়, নেয়ামত তথা আশীর্বাদ ও মো’জেযা (অলৌকিকত্ব)-এর কথা উল্লেখিত হয়, কিছুই যাতে বাদ না পড়ে। এটা মহান আল্লাহতা’লার সুন্নাত (রীতিনীতি) এবং এর পক্ষেই আল-কুরআনের অবস্থান। অন্যান্য পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মওলিদের কথা ঐশী কালাম (বাণী)-এর সূত্রে আমাদের মহানবী (দ:)-ই প্রকাশ করেছেন; আর স্পষ্টতঃ আমাদের প্রিয়নবী (দ:)-এর মওলিদের স্মরণ অনাগত প্রজন্মগুলোই করবেন, যেহেতু তাঁর পরে অন্য কোনো নবী আর আসবেন না। এই কারণেই তাঁর যিকর-তাযকেরা (স্মরণ) এ উম্মতকেই করতে হবে।